যখন বিটলস বাংলাদেশের জন্য বাজাল — এবং বাংলাদেশ বিটলসকে নিজের করে নিল
আমি প্রথম শুনেছিলাম কনসার্ট ফর বাংলাদেশের ট্রিপল অ্যালবামটা বাসার পুরনো আলমারি থেকে বের করে। ভিনাইলের ওপর সুচ বসাতেই একটা গর্জন — হ্যারিসনের ফেন্ডার স্ট্র্যাটোক্যাস্টারের ওই ঝাঁঝালো টোনটা কানে এসে ধাক্কা দিল। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ৪০,০০০ মানুষ। জর্জ হ্যারিসন মঞ্চে। পাঁচ বছর ধরে বড় কোনো লাইভ শো করেননি — বিটলসের ট্যুর বন্ধের পর থেকে।
কিন্তু হ্যারিসন কি জানতেন তিনি কী শুরু করছেন?
বন্ধু রবিশঙ্কর ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন বাংলাদেশে লোকে মরছে, কিছু একটা করো। হ্যারিসন করলেন। সেই রাতে তোলা হলো আড়াই লক্ষ ডলার। পরে অ্যালবাম বিক্রি, ফিল্ম রয়্যালটি মিলিয়ে দাঁড়াল প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ডলার — মুক্তিযুদ্ধে ছিন্নভিন্ন একটা দেশের জন্য। ইতিহাসের প্রথম বড় চ্যারিটি কনসার্ট। লাইভ এইড, ফার্ম এইড — পরে যা-ই হয়েছে, বীজটা এখানে।
ব্যাপারটা হলো, হ্যারিসন যখন নিউ ইয়র্কে "বাংলাদেশ, বাংলাদেশ" গাইছেন, ঠিক তখন ঢাকার কোনো ছাত্রাবাসে একদল ছেলে বিটলসের "Let It Be" বাজানোর চেষ্টা করছে একটা জোড়াতালি দেওয়া গিটারে। তারা ভাবছে — এই সুরটা বাংলায় গাইলে কেমন শোনাবে?
ব্রিটিশ ইনভেশন ঢাকায় পৌঁছল
বিটলস এসেছিল বাংলাদেশ জন্মানোরও আগে। সত্যি বলতে কি, অনেক আগে।
ষাটের দশক। গ্রামোফোন কোম্পানি অব পাকিস্তান এলপি আর সিঙ্গেল রেকর্ড আনত পূর্ব পাকিস্তানে — এলভিস প্রেসলি, রোলিং স্টোনস, বিচ বয়স, আর বিটলস। ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলে হলে ঘুরত এই রেকর্ডগুলো। চট্টগ্রামের কলেজ পড়ুয়ারা বন্ধুর বাসায় গিয়ে শুনত। একটা রেকর্ড দশ জনে ভাগ করে কিনত। ইলেকট্রিক গিটারের ওই ঝনঝনে ধাতব শব্দটা — ওইটাই ছিল তাদের প্রথম ধাক্কা।
১৯৬৪ সালে ঢাকায় দাঁড়াল উইন্ডি সাইড অব কেয়ার। বাংলাদেশের প্রাচীনতম হার্ড রক ব্যান্ডগুলোর একটি। এলভিস আর ক্লিফ রিচার্ডের গান কভার করতে করতে শুরু, তারপর সাইকেডেলিক রক, ব্লুজ, আর তার সাথে বাংলার ধ্রুপদী সুর মিলিয়ে দিলেন। প্র্যাকটিসে এত জোরে বাজাতেন যে পাড়ার বড়রা এসে বকাঝকা করত — "এসব কী পাগলামো!" বাণিজ্যিক সাফল্য? না, তেমন হয়নি। কিন্তু এখানেই মজার ব্যাপার — তারা দেখিয়ে দিলেন যে বাংলাদেশের ছেলেরা শুধু পশ্চিমা গান শোনে না, নিজেরা ভেঙেচুরে নতুন কিছু বানায়।
১৯৭০-এর দশক: একটি স্বাধীন দেশ তার রক কণ্ঠ খুঁজে পায়
১৯৭১। বাংলাদেশ স্বাধীন। একই বছর ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধ একটা পুরো প্রজন্মের মাথায় ঢুকিয়ে দিল — গান শুধু মনোরঞ্জন না, গান দিয়ে সত্যি কথা বলা যায়। আর সেই কথাটাই সবচেয়ে জোরে বললেন আজম খান। লোকটা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ শেষে ১৯৭৩-তে গড়লেন উচ্চারণ ব্যান্ড। "ওরে সালেকা, ওরে মালেকা" — গানটা শুনলে গায়ে কাঁটা দিত। "রেল লাইনের বস্তিতে" গানে স্বাধীনতার পরের হতাশাটা চাপা ছিল না, সরাসরি বলা। লম্বা চুল, অদ্ভুত পোশাক, গলায় যেন কাঁচা আগুন। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমি গাই কারণ চুপ থাকতে পারি না।" বাংলাদেশ তাকে বলে "পপ গুরু"।
সবাই একমত না এই প্রভাব নিয়ে — কেউ কেউ বলেন আজম খান পুরোটাই দেশি, পশ্চিমা প্রভাব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ইলেকট্রিক গিটারটা তো লন্ডন থেকেই এসেছিল, তাই না?
আখন্দ ভাইয়েরা — লাকি আর হ্যাপি — একদম অন্য জায়গা থেকে এলেন। "আবার এলো যে সন্ধ্যা" (১৯৭২) শুনলে মনে হয় সন্ধ্যার হাওয়া গায়ে লাগছে। "কে বাঁশি বাজাই রে" (১৯৭৪) — খাঁটি বাংলা মেলোডি, কিন্তু পেছনে ওয়েস্টার্ন ড্রামস আর বেজ গিটারের গ্রুভ। প্রমাণ হলো বাংলা সুর পশ্চিমা যন্ত্রে বসলে ভেঙে পড়ে না — বরং আরও ঝলমল করে।
আর সেটাই গুরুত্বপূর্ণ কারণ হ্যাপি আখন্দ পরে একটা কাজ করেছিলেন যেটা বাংলাদেশের রক ইতিহাস বদলে দিল। চট্টগ্রামের এক তরুণ গিটারিস্টকে হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন। ছেলেটার নাম — আইয়ুব বাচ্চু।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি ঢাকা আর চট্টগ্রামে ২০-৩০টা ব্যান্ড নিয়মিত বাজাত — হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে, ক্লাবে, কলেজ ফেস্টে। কর্ড প্রোগ্রেশনে ব্রিটিশ ইনভেশনের ছাপ স্পষ্ট। গিটারের টোনে শুনলে বোঝা যেত। কিন্তু মুখে যে কথা, সেটা ছিল পুরোদস্তুর বাংলাদেশি।
১৯৮০-৯০-এর দশক: সোনালি যুগ
তিনটা নাম। সোলস। মাইলস। ফিডব্যাক। বাংলাদেশের রক ইতিহাস এই তিনটা স্তম্ভ ছাড়া লেখা সম্ভব না।
১৯৮০ সালে সোলস বের করল "সুপার সোলস" — বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড অ্যালবাম। "মন শুধু মন ছুঁয়েছে" গানটা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবার মুখে। ক্যাসেটের দোকানে লাইন পড়ে যেত। এটা ছিল একটা বড় ব্যাপার — কারণ এর আগে কেউ ভাবেনি বাংলায় রক গেয়ে ক্যাসেট বিক্রিও করা যায়।
মাইলস গড়েছিলেন হ্যাপি আখন্দ, ১৯৭৮ সালে। পশ্চিমা পপ-রকের ফ্রেমে বাংলা মেলোডি বসিয়ে তারা এমন একটা সাউন্ড তৈরি করলেন যেটা শুনলে চেনা যেত — "ওই তো মাইলস বাজছে।" আর ফিডব্যাক? তারা আনলেন জ্যাজের ছোঁয়া — সূক্ষ্ম, জটিল, একটু ভিন্নধারার শ্রোতাদের জন্য।
এখন একটু থামুন। এই ব্যান্ডগুলো কি সরাসরি বিটলসের কোনো রিফ কপি করেছিল? না, মোটেও না। ব্যাপারটা অন্যরকম। বিটলস যে মডেলটা দেখিয়েছিল — আসল অনুভূতি, সমাজের কথা, সব একটা পপ গানের কাঠামোতে ভরে দাও — সেই আইডিয়াটাই এরা নিলেন। রিভলভার অ্যালবামে বিটলস দেখিয়েছিল রক মিউজিক ইচ্ছেমতো জটিল হতে পারে। সার্জেন্ট পেপার দেখাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সরলতা পাশাপাশি থাকতে পারে। ওই সিলিং ভাঙার ব্যাপারটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তারপর এলেন ভারী ধাতুর যোদ্ধারা। ওয়ারফেজ (১৯৮৪) আয়রন মেডেন আর ডিপ পার্পলের রাস্তায় হাঁটলেন। আর্টসেল (১৯৯৯) লেড জেপেলিনের ভারিক্কি রিফের সঙ্গে মিশালেন বাংলা লোকসুরের টান। আর্টসেলের "অনিকেত প্রান্তর" (২০০৬) — ইউটিউবে ৫ কোটি+ ভিউ — বাংলাদেশের প্রগ্রেসিভ মেটালের ইতিহাসে মাইলফলক। গানটা শুনলে বুঝবেন — প্রথম মিনিটে মনে হবে পিংক ফ্লয়েড, তারপর হঠাৎ বাংলার গ্রামের কোনো বাউলের সুর ভেসে আসবে।
কিন্তু এই পুরো যুগের প্রাণ ছিলেন একজন। আইয়ুব বাচ্চু।
এলআরবি — লাভ রানস ব্লাইন্ড — তার ব্যান্ড। গিটারে আঙুল বসালে স্টুডিও ৫৮-র পুরো ঘরটা কাঁপত। বাংলাদেশের নিজস্ব বিটলস-মাপের সাংস্কৃতিক ঘটনা বলতে যদি কাউকে বোঝায়, তো আইয়ুব বাচ্চু। ২০১৮ সালে যখন মারা গেলেন, পুরো দেশ থমকে গিয়েছিল। রিকশাওয়ালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর — সবাই বলছিল একই কথা: "একটা যুগ শেষ হয়ে গেল।"
কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: যে উত্তরাধিকার বিবর্ণ হয়নি
একটু পেছনে ফিরি।
রবিশঙ্কর হ্যারিসনকে সিতার শিখিয়েছিলেন। সেই শেখা বিটলসের সাইকেডেলিক পর্বটাকে গড়ে দিয়েছিল — "Norwegian Wood"-এ সিতারের শব্দ শুনে পশ্চিমা দুনিয়া প্রথমবার কান খাড়া করেছিল। তো যখন রবিশঙ্কর বললেন বাংলাদেশে সাহায্য দরকার, হ্যারিসন "না" বলেননি। বলার প্রশ্নই ওঠেনি — এই মানুষটা তাকে সংগীতের এমন একটা দুনিয়া দেখিয়েছিলেন যেটা তিনি কল্পনাও করতে পারতেন না।
সেই কনসার্টের মঞ্চে কারা ছিলেন ভাবুন তো — হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল। ডিলান তিন বছর ধরে কোনো লাইভ শো করেননি, এই কনসার্টের জন্য এলেন! "বাংলাদেশ" শব্দটা সেই রাতে রক মিউজিকের ইতিহাসে ঢুকে গেল — ঠিক যখন দেশটা রক্তের ভেতর দিয়ে জন্ম নিচ্ছে।
বাংলাদেশের মানুষ এই কনসার্টটা মনে রাখে কৃতজ্ঞতায়, একটু গর্বে, আর একটু অবাক হয়ে। ভাবুন — পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত রক মিউজিশিয়ানরা, আপনার দেশের নাম নিয়ে, লক্ষ মানুষের সামনে। এটা প্রমাণ করেছিল রক সংগীত শুধু বিনোদন না — সংহতির একটা ভাষাও হতে পারে।
বিটলসের পরম্পরা: আজকের বাংলাদেশ
আজকের কথায় আসি। বিটলসের নাম ধরে কি কেউ গান করছে ঢাকায়? সরাসরি, না। কিন্তু প্রভাবটা আছে — চামড়ার নিচে, হাড়ের কাছে।
শিরোনামহীন মঞ্চে সারোদ আর এসরাজ বাজায় ইলেকট্রিক গিটারের পাশে। চিরকুট বাউলের সুর ধরে রক কনসার্ট করে। জলের গানের রাহুল আনন্দ — ম্যাক্রোঁ ২০২৩ সালে ঢাকায় এসে তার স্টুডিও দেখে গেলেন — লোকসংগীত আর রকের এমন একটা মিশ্রণ বানান যেটা প্রথম শুনলে বিটলসের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক মনে হয় না। কিন্তু ভাবুন — পুরনো, শিকড়ে গাঁথা সংগীতকে ইলেকট্রিক করা যায় তার আত্মাটা না মেরে — এই শিক্ষাটা কোথা থেকে এলো? বিটলসই তো প্রথম দেখিয়েছিল।
নেমেসিস, আরবোভাইরাস — এরা মঞ্চে উঠলে পাওয়ার কর্ড বাজে, মশ পিট হয়, ঘাম ঝরে। কিন্তু গানের কথায় লালনের ছায়া। এমিনেমের ধাঁচে র্যাপ যারা শুরু করলেন তাদের পাশেই ব্যান্ড মিউজিকের ধারাটা থেমে থাকেনি।
চ্যালেঞ্জ আছে। পাইরেসি ভয়ানক। স্ট্রিমিং থেকে আয় যৎসামান্য — একজন মিউজিশিয়ান আমাকে বলেছিলেন, "স্পটিফাই থেকে এক মাসে যা পাই তা দিয়ে ঢাকায় দুইবেলা চা খেতে পারি।" লাইভ মিউজিকের ভেন্যু কম। কিন্তু সৃজনশীলতা? সেটা কমেনি। ইউটিউবে ঢাকার গ্যারেজ ব্যান্ডের ছেলেরা নিজেদের গান আপলোড করছে, আর কিছু কিছু ভিউ লক্ষ ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
ষাটের দশকে কোনো ঢাকার ছাত্র প্রথম গ্রামোফোনে বিটলসের এলপি বাজাল, আর আজ তার নাতি ইউটিউবে নিজের গান আপলোড করছে। সুতোটা কিন্তু ছেঁড়েনি।
কেন এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ
সংগীতের ইতিহাস বেশিরভাগ সময় একমুখী গল্প বলে। লন্ডন থেকে বিশ্বে। মেমফিস থেকে বিশ্বে। নিউ ইয়র্ক থেকে বিশ্বে। বাংলাদেশ আর বিটলসের গল্পটা ওই ছকটাকে ভেঙে দেয়।
বাংলাদেশ ক্লাসিক রক নিয়ে যা করেছে সেটা প্রতিটা সংস্কৃতি করে — বাইরের জিনিস নিজের ভাষায় অনুবাদ করে ফেলে। বাংলা ধ্রুপদী ছন্দ, বাউলের দর্শন, বাংলা শব্দের যে নিজস্ব ওজন আছে — এসব রকের কাঠামোতে ঢুকে এমন সংগীত বানিয়েছে যেটা পৃথিবীর অন্য কোথাও তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল না।
আর বিটলস? তারাও ফিরিয়ে দিয়েছিল। রবিশঙ্করের কাছ থেকে হ্যারিসন শিখেছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত কী জিনিস। সেই হ্যারিসনই সংকটের সময় বিশ্বের চোখ ঘুরিয়ে দিলেন বাংলাদেশের দিকে।
এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় কথা। বাংলাদেশে বিটলসের আসল উত্তরাধিকার কোনো নির্দিষ্ট কর্ড প্রোগ্রেশন বা গায়কির ধরন না। আসল উত্তরাধিকার হলো এই সত্যটা — সংগীত সীমানা পেরোয়, দুদিক থেকেই। আর যা ফিরে আসে, সেটা সবসময় আগের চেয়ে সমৃদ্ধ।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধটি বিনোদন ও সাংস্কৃতিক ভাষ্য উদ্দেশ্যে আমাদের সম্পাদকীয় দলের দ্বারা তৈরি।