যে তারকা কোনো সীমানা মানেনি

২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি। ডেভিড বোয়ি মারা যান, তাঁর ৬৯তম জন্মদিনের মাত্র দুদিন পর। সেদিন সকালে লন্ডন থেকে লাগোস, নিউ ইয়র্ক থেকে নয়াদিল্লি — পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি শহরে সংগীতপ্রেমীরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু যেটা অনেকেই ভাবেননি, সেটা হলো ঢাকাতেও সেই শোক একেবারে আলাদা ছিল না। যে মানুষটি কখনো বাংলাদেশে আসেননি, কনসার্ট করেননি, তাঁর মৃত্যুতে এই দেশের সংগীতজগতেও একটা নিঃশব্দ শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।

কারণটা সরল নয়। বোয়ির প্রভাব কোনো একটা গানে বা অ্যালবামে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মূলত একটা ধারণা রপ্তানি করেছিলেন — যে শিল্পী চাইলে নিজেকে বারবার ভেঙে নতুন করে গড়তে পারে, ঐতিহ্য আর পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে একসাথে ধরে রাখতে পারে, এবং এই মিশ্রণকে দুর্বলতা না বলে শক্তি বলা যায়।

পুনরাবিষ্কারের শিল্পী

বোয়ির ক্যারিয়ারটা দেখলে মাথা ঘুরে যায়। সত্তর দশকে জিগি স্টারডাস্ট নামের কাল্পনিক এলিয়েন রক স্টার, তারপর সোউল ফাংক, বার্লিন-যুগের আর্ট রক, আশির দশকে মেইনস্ট্রিম পপ, নব্বই ও দুহাজারের দশকে প্রবীণ পরীক্ষক। প্রতিটি রূপান্তর ছিল সম্পূর্ণ। কখনো ক্ষমা চাননি, কখনো পুরনো সাফল্যের উপর বসে থাকেননি।

দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পীদের কাছে এই দর্শনটাই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান। গ্ল্যাম রক ঢাকা বা দিল্লিতে কখনো বড় ঘটনা ছিল না। কিন্তু বোয়ির এই ধারণাটা — যে একজন শিল্পী থিয়েটার, ইলেকট্রনিক সংগীত, কবিতা, এবং রক একসাথে মেশাতে পারে — সেটা এই অঞ্চলের শিল্পীদের জন্য একটা যুক্তি হয়ে উঠেছিল। যদি বোয়ি ব্রেশটকে রকের সঙ্গে মেলাতে পারেন, তাহলে একজন বাঙালি শিল্পী ভাটিয়ালির সুরকে পোস্ট-পাংকের সঙ্গে মেলাতে পারবে না কেন?

লিঙ্গ পরিচয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ঐতিহ্য

বোয়ির অ্যান্ড্রোজিনি — পুরুষ-নারীর সীমারেখাকে উপেক্ষা করা — পশ্চিমে মূলত LGBTQ+ দৃশ্যমানতার প্রশ্ন হিসেবে পড়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই অনুরণনটা কিছুটা ভিন্ন ছিল, তবে কম গভীর নয়।

এই অঞ্চলে লিঙ্গ-বৈচিত্র্যের ঐতিহ্য শতাব্দীর পুরনো। হিজড়া সম্প্রদায়ের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা, কত্থক ও ভরতনাট্যম নৃত্যের মধ্যে পুরুষ শিল্পীর নারী চরিত্র রূপায়ণ — এগুলো ঔপনিবেশিক যুগেরও আগের। বোয়ির মঞ্চায়ন এই ঐতিহ্যকে নতুন করে বৈধতা দিল না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটা ভাষা তৈরি করে দিল যার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে বৈশ্বিক দর্শকের কাছে বোঝানো সহজ হলো। পাকিস্তানি শিল্পী আলী সেঠি, যিনি সুফি সংগীত ও সমকামিতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন, এই আন্তর্জাতিক কথোপকথনের সুবিধাভোগী।

ভারতের রক আন্ডারগ্রাউন্ড

সত্তর-আশির দশকে কলকাতা ও বোম্বাইতে যে ভারতীয় রক দৃশ্য গড়ে উঠছিল, সেখানে বোয়ি পৌঁছেছিলেন বুটলেগ ক্যাসেটে, এমটিভি এশিয়ার মাধ্যমে, এবং মুখে মুখে। Indus Creed বা Parikrama-র মতো ব্যান্ডগুলো পশ্চিমা রক জায়ান্টদের প্রভাব নিয়ে কথা বলেছে, এবং বোয়ির নাম সেখানে বারবার এসেছে।

ব্যাপারটা নকলের ছিল না। ব্যাপারটা ছিল পদ্ধতির। বোয়ি যদি পশ্চিমা পপকে ভারতীয় রাগ সংগীতের সাথে মেলাতে পারতেন — যা তিনি কিছুটা করেছিলেনও, বিশেষত তাঁর পরের ক্যারিয়ারে — তাহলে ভারতীয় মিউজিশিয়ানরা রক স্ট্রাকচারের মধ্যে কর্ণাটিক স্কেল ব্যবহার করতে পারবে কেন না? সেই প্রশ্নটাকে বোয়ির ক্যারিয়ার একটা উত্তর দিয়েছিল।

বাংলাদেশ: DIY-এর সমান্তরাল ইতিহাস

বাংলাদেশে পশ্চিমা জনপ্রিয় সংগীতের সঙ্গে সম্পর্ক সবসময় কিছুটা জটিল। অবকাঠামোর অভাব, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা একদিকে। কিন্তু ঠিক এই সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেই বাংলাদেশের সবচেয়ে সাহসী সংগীত বেরিয়েছে। ঢাকার ডিআইওয়াই ইলেকট্রনিক সংগীত দৃশ্যটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় হিসেবে আন্তর্জাতিক মিউজিক মিডিয়া স্বীকার করেছে।

২০১২ সালে ফেসবুক গ্রুপ থেকে শুরু হওয়া ঢাকা ইলেকট্রনিক সিন কয়েকজন বেডরুম প্রোডিউসার থেকে ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ওয়ার্কশপ, কোলাবরেশন, রিলিজ — সবকিছু মূলধারার বাইরে, নিজেদের শর্তে। এই কাঠামোটা বোয়ির প্রাথমিক ক্যারিয়ারের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়: বছরের পর বছর ছোট লন্ডন ভেন্যুতে পরীক্ষা, ব্যর্থতা, পুনরায় গড়ে ওঠা।

ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী ও নিউ ইয়র্কে বড় হওয়া সংগীতশিল্পী জাই উলফ এই উত্তরাধিকারের একটি জীবন্ত উদাহরণ। ইন্ডি-পাংক থেকে হিপ-হপ, বলিউড ক্লাসিক থেকে ড্রিম পপ — তাঁর সংগীতের বিস্তার ঠিক সেই ধরনের ঘরানা-অতিক্রান্ত স্বাধীনতাকে প্রতিফলিত করে যা বোয়ি বৈধ করে দিয়েছিলেন।

উৎসব মঞ্চে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন আত্মবিশ্বাস

গত এক দশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পীদের উপস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। ২০২৪ সালের মার্চে লন্ডনের সাউথব্যাংক সেন্টারে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান সাউন্ডস ফেস্টিভাল এর একটি প্রতীক। পাঞ্জাবি ভাংড়া থেকে হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল, ইলেকট্রনিক ইন্দো-জ্যাজ থেকে ব্রিটিশ-বাঙালি ফিউশন ব্যান্ড — একটি প্রধান পশ্চিমা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এই বৈচিত্র্য এশির দশকে অকল্পনীয় ছিল।

বাংলাদেশের নিজের মঞ্চেও পরিবর্তন দৃশ্যমান। ২০২৪ সালে বাদশাহ, আতিফ আসলাম, উস্তাদ রাহাত ফতেহ আলী খান-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক শিল্পী ঢাকায় পারফর্ম করেছেন। এটি শুধু বিনোদনের প্রশ্ন নয়; এটি একটি দেশের সংগীত দর্শকের পরিপক্কতার সংকেত — যারা এখন বৈশ্বিক সংগীতকে নিজেদের সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারেন।

বাংলাদেশের জাদুকর খ্যাত শিল্পী প্রীতম হাসান বলেছেন, একতারা, দোতারা, হারমোনিয়াম, মন্দিরা, ঢোল — এই দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেই তিনি তাঁর সংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিচয় দিতে চান। মডার্ন ফোক আর ফিউশন ফোককে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এই লক্ষ্যটা বোয়ির নিজের পদ্ধতির সঙ্গে মিলে যায় — পার্থক্য শুধু উপকরণে।

ট্রিবিউট কনসার্ট আসলে কীসের উদযাপন করে

বোয়ির মৃত্যুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ট্রিবিউট কনসার্ট হয়েছে। প্ল্যানেটেরিয়াম থেকে বেসমেন্ট ক্লাব, শহরের কেন্দ্র থেকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। এগুলোর উদ্দেশ্য শুধু বোয়ির গান উদযাপন নয়। ভালো ট্রিবিউট কনসার্টগুলো আসলে বোয়ির যুক্তিটাকে মঞ্চস্থ করে — বিভিন্ন ঘরানা, বিভিন্ন পটভূমির শিল্পীদের একই মঞ্চে তুলে একই গানের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি করা।

দক্ষিণ এশিয়ায় এই অনুমতিটা এমন সব দিকে ব্যবহৃত হচ্ছে যা বোয়ি হয়তো ভাবেননি। কাওয়ালি আর ইলেকট্রনিক প্রোডাকশনের মিশ্রণ। ভাংড়া আর অ্যাম্বিয়েন্ট ইলেকট্রনিকার ফিউশন। বাংলাদেশের বেডরুম প্রোডিউসারদের কাজ যা আন্তর্জাতিক মিউজিক মিডিয়ায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। এই শিল্পীরা কেউই বোয়িকে সরাসরি প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করেন না। বেশিরভাগকেই করতে হয় না।

সীমানাহীন উত্তরাধিকার

জীবদ্দশায় বোয়ির রেকর্ড বিক্রির সংখ্যা ছিল আনুমানিক দশ কোটিরও বেশি। ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি একুশ শতকের সর্বাধিক ভিনাইল বিক্রীত শিল্পী ছিলেন। এই সংখ্যাগুলো একটি গল্প বলে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ গল্পটা সংখ্যায় নেই — সেই সব শিল্পীদের কথা যারা জিগি স্টারডাস্ট বা ব্ল্যাকস্টারে কিছু একটা শুনেছিলেন এবং বুঝেছিলেন যে তাদের দেওয়া নিয়মগুলোই একমাত্র নিয়ম নয়।

বাংলাদেশে, যেখানে সংগীত শিল্প দশকের পর দশক আর্থিক সীমাবদ্ধতা আর অবকাঠামোগত শূন্যতার মধ্যে টিকে থেকেছে, সেখানে এই বার্তাটির ওজন বিশেষভাবে অনুভূত হয়। ঢাকার ইলেকট্রনিক দৃশ্যে যারা কাজ করছেন, লোকসংগীতকে পোস্ট-পাংকের সঙ্গে মেলাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক ইলেকট্রনিক সংগীতে বাংলাদেশি পরিচয় বহন করছেন — তারা সবাই সেই সাহসী আত্মপ্রকাশের ঐতিহ্যে কাজ করছেন যাকে বোয়ি সারা পৃথিবীর কাছে বৈধ করে গেছেন।

তিনি কখনো ঢাকায় আসেননি। কিন্তু স্টারম্যানের সংকেত এখানেও পৌঁছে গিয়েছিল।

win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধটি আমাদের বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ বিষয়ক ধারাবাহিক কভারেজের অংশ।