আমি লক্ষ্য করেছি একটা জিনিস। ঢাকার রাস্তায় রিকশাচালক থেকে শুরু করে গার্মেন্টস কর্মী—সবার হাতে এখন স্মার্টফোন, আর সেই ফোনে চলছে ইউটিউব, হই চই, চর্কি। দশ বছর আগেও এটা কল্পনা করা কঠিন ছিল।
সত্যি বলতে, বাংলাদেশের বিনোদন জগৎটা আমূল পাল্টে গেছে। BTV-র রাত আটটার নাটক দেখার জন্য গোটা পরিবার একসাথে বসত—সেই দিন শেষ। এখন ১৩ কোটিরও বেশি মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (BTRC-র ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী) নিজের সময়ে, নিজের পছন্দে কনটেন্ট দেখছে। স্ট্রিমিং শুধু একটা নতুন প্রযুক্তি না—এটা মানুষের জীবনযাপনের ধরনটাই বদলে দিয়েছে।
আর এই বদলটা শুধু গুলশান-বনানীর ছেলেমেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। মফস্বলের কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ নানা—সবাই ধীরে ধীরে এই জগতে ঢুকে পড়ছে।
নির্দিষ্ট সময়ের টেলিভিশন থেকে অন-ডিমান্ড বিনোদনে পরিবর্তন
মনে আছে? রাত সাড়ে আটটায় “ইত্যাদি” শুরু হবে, তাই আগে থেকেই খাওয়া-দাওয়া সেরে ফেলতে হতো। পাড়ার কারো বাসায় ক্যাবল না থাকলে সে পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখত। অনুষ্ঠান মিস? তাহলে শেষ—পরের সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা।
এই পুরো ব্যাপারটা উল্টে গেছে।
আমার এক বন্ধু মিরপুরে গার্মেন্টসে কাজ করে। সে বলল, লাঞ্চ ব্রেকের ৩০ মিনিটে হই চই-তে “ঢাকা মেট্রো” সিরিজের এক পর্ব দেখে ফেলে। রাতে বাসায় ফিরে বাকিটা। কেউ তাকে বলে দিচ্ছে না কখন দেখতে হবে—সে নিজেই ঠিক করছে। এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
”প্রাইম টাইম” বলে কিছু আর নেই, সত্যি বলতে। এখন প্রাইম টাইম হলো—যখন তোমার হাতে ফোন আর একটু ফ্রি সময়।
মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত বিনোদনের উত্থান
একটা তথ্য দিই। বাংলাদেশে এখনো বেশিরভাগ মানুষ ল্যাপটপ বা স্মার্ট টিভি কিনতে পারে না। কিন্তু ৫-৬ হাজার টাকার স্মার্টফোন? সেটা প্রায় সবার হাতে।
গ্রামীণফোনের ৩০ টাকা ডেটা প্যাক দিয়ে একটা সন্ধ্যা কাটানো যায়। চর্কি মাত্র ৯৯ টাকায় মাসিক সাবস্ক্রিপশন দেয়। হই চই ১৪৯ টাকা। বিকাশ দিয়ে পেমেন্ট—ব্যাংক একাউন্টের দরকার নেই। এই পুরো ইকোসিস্টেমটা বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে মানানসই করে তৈরি হয়েছে।
তবে একটা জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে। আগে পরিবারের সবাই মিলে একটা টিভির সামনে বসত—সেখানে একটা উষ্ণতা ছিল। এখন বাবা ফোনে ক্রিকেট হাইলাইটস দেখছে, মা কোরিয়ান ড্রামা, ছেলে গেমিং স্ট্রিম। একই ঘরে তিনজন, তিন আলাদা জগৎ। আমার মনে হয় এটা ভালো-মন্দ দুটোই।
স্বল্পদৈর্ঘ্যের কনটেন্ট ও মনোযোগের পরিবর্তন
টিকটক, ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস—৩০ সেকেন্ড থেকে ৩ মিনিটের ভিডিও। এগুলো বাংলাদেশে এতটাই জনপ্রিয় যে অনেক তরুণ এখন দুই ঘণ্টার সিনেমায় ধৈর্য রাখতে পারে না।
কিন্তু আমি একমত না যে মনোযোগ কমে গেছে। বরং মনোযোগ এখন বেশি দামি হয়ে গেছে। দর্শক প্রথম ১০ সেকেন্ডে সিদ্ধান্ত নেয়—এটা দেখব কি না। কনটেন্ট ধরে রাখতে না পারলে? সোয়াইপ।
মজার ব্যাপার হলো, “মোশারি”-র মতো শর্ট ফিল্ম কিন্তু অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছে। মানে ছোট কনটেন্ট মানেই নিম্নমানের—এই ধারণা ভুল।

ব্যক্তিগত পছন্দ ও অ্যালগরিদমিক কনটেন্ট আবিষ্কার
একটু ভেবে দেখুন। আপনি আজকে হই চই-তে একটা থ্রিলার দেখলেন। কালকে অ্যাপ খুললে দেখবেন সামনে আরো পাঁচটা থ্রিলার সাজানো। অ্যালগরিদম আপনাকে চেনে—হয়তো আপনার চেয়েও ভালো।
সমস্যাটা কোথায় জানেন? একটা “বাবল” তৈরি হয়। আমি আর আমার পাশের ফ্ল্যাটের ভাই—দুজনেই চর্কি ব্যবহার করি। কিন্তু আমার হোমপেজ আর ওর হোমপেজ সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা একই প্ল্যাটফর্মে আছি, কিন্তু একেবারে ভিন্ন দুনিয়ায়।
আগে বায়োস্কোপে বা BTV-তে সবাই একই জিনিস দেখত। এখন? হাজার রকম পছন্দ, হাজার রকম অভিজ্ঞতা। এতে বৈচিত্র্য বাড়ছে, কিন্তু সাধারণ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাটা কমছে।
বিঞ্জ-ওয়াচিং ও নমনীয় দেখার ধরন
বিঞ্জ-ওয়াচিং এখন বাংলাদেশেও একটা সংস্কৃতি। শুক্রবার রাতে হই চই-তে নতুন সিরিজ এলো? অনেকে শনিবার সকালের মধ্যে পুরোটা শেষ করে ফেলে।
তবে সবাই এরকম না।
আমার আব্বু প্রতিদিন রাতে ঠিক একটা পর্ব দেখেন। বেশি না। উনার কথায়, “তাড়াতাড়ি শেষ করলে পরে কী দেখব?” এই দুই ধরনের দর্শকই এখন পাশাপাশি আছে। কেউ গোগ্রাসে গিলছে, কেউ আস্তে আস্তে চিবিয়ে খাচ্ছে—প্ল্যাটফর্ম দুজনকেই জায়গা দিচ্ছে।
আর এই নমনীয়তার কারণে গল্প বলার ধরনও বদলাচ্ছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এমনভাবে সিরিজ বানাচ্ছে যেন প্রতিটা পর্ব আলাদাভাবেও টিকে, আবার একসাথেও চলে।
নিষ্ক্রিয় বিনোদন থেকে সক্রিয় দর্শক
আগে টিভি ছিল একমুখী। যা দেখানো হতো, দেখতে হতো। রিমোটের ক্ষমতা ছিল চ্যানেল বদলানো পর্যন্ত।
এখন? সম্পূর্ণ অন্য গল্প।
দর্শক এখন স্কিপ করে, ফরওয়ার্ড করে, রিভিউ পড়ে দেখার আগে, কমেন্টে স্পয়লার চেক করে, তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। ১০ মিনিট দেখে বোরিং লাগলে? বন্ধ। অন্য কিছু চালু। এটা আগে সম্ভবই ছিল না। কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এটা একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সুযোগ—কারণ ভালো জিনিস এখন অনেক দ্রুত ভাইরাল হয়।

একসাথে না দেখেও সামাজিক বিনোদন
একটা মজার প্যারাডক্স আছে এখানে। সবাই আলাদা আলাদা ফোনে দেখছে, কিন্তু আলোচনা কমেনি—বরং বেড়েছে।
ফেসবুক গ্রুপে “ঢাকা মেট্রো” নিয়ে হাজার হাজার পোস্ট। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে “কালকের পর্ব দেখেছিস?” এই প্রশ্ন রোজ। আমার অফিসেও দেখি—সোমবার সকালে চায়ের কাপে শুক্রবারের সিরিজ নিয়ে তর্ক।
একসাথে দেখা কমেছে, কিন্তু একসাথে আলোচনা? সেটা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। পথটা আলাদা, গন্তব্য একই।
কনটেন্ট নির্মাতা ও মিডিয়ার উপর প্রভাব
বাংলাদেশের কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এটা একটা সোনালি সময়—আর একই সাথে সবচেয়ে কঠিন সময়।
আগে একটা নাটক বানালে BTV বা কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেলের দরজায় ধরনা দিতে হতো। এখন? চর্কি, হই চই, এমনকি সরাসরি ইউটিউবে আপলোড করলেও দর্শক পাওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রতিযোগিতা? ভয়ানক। প্রতিদিন শত শত কনটেন্ট আসছে। আপনার প্রথম তিন মিনিটে ধরতে না পারলে দর্শক চলে যাবে।
ছোট স্ক্রিনের জন্য ক্লোজ-আপ বেশি লাগে, সাবটাইটেল বড় করতে হয়, সাউন্ড ডিজাইন আলাদা করতে হয়—কারণ অনেকে হেডফোন ছাড়াই দেখে। এসব ছোট ছোট বিষয় আসলে পুরো ক্রাফটটাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বিনোদন: বিশেষ ঘটনা নয়, দৈনন্দিন সঙ্গী
সবচেয়ে বড় শিফটটা কী জানেন? বিনোদন আর “স্পেশাল” কিছু না। আগে সিনেমা হলে যাওয়া একটা ইভেন্ট ছিল। এখন ফোনে কনটেন্ট দেখা ভাত খাওয়ার মতোই স্বাভাবিক।
সকালে বাসে দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিটের ক্লিপ। দুপুরে অফিসের ব্রেকে দশ মিনিট। রাতে ঘুমানোর আগে একটা পর্ব। বিনোদন ছোট ছোট টুকরোয় সারাদিন ছড়িয়ে আছে।
আমার মনে হয়, এটা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখছে—ভালো আর মন্দ দুদিকেই। ক্লান্তি দূর হচ্ছে, কিন্তু অনেকে আবার আসক্তও হয়ে পড়ছে। এই ব্যালেন্সটা এখনো আমরা বুঝে উঠতে পারিনি।
চলমান এক পরিবর্তন
এই গল্পটা শেষ হয়নি। সত্যি বলতে, শুরু হয়েছে মাত্র।
5G আসবে, ইন্টারনেটের দাম আরো কমবে, গ্রামে-গঞ্জে কানেক্টিভিটি বাড়বে—তখন আরো কোটি কোটি মানুষ এই স্ট্রিমিং দুনিয়ায় ঢুকবে। বাংলাদেশের নিজস্ব কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রি কোন দিকে যাবে—ঢালিউড নতুন করে জন্ম নেবে নাকি ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোই সব গিলে খাবে—সেটা এখনো অনিশ্চিত।
তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত: আগের সেই টেলিভিশনকেন্দ্রিক দিন আর ফিরবে না। নিয়ন্ত্রণ এখন দর্শকের হাতে, পছন্দ ব্যক্তিগত, সময় নমনীয়। আর এই পরিবর্তনটা শুধু বিনোদন না—আমাদের পুরো ডিজিটাল জীবনযাপনেরই একটা প্রতিফলন।