ঢাকার রাস্তায় আল জাজিরা যা খুঁজে পেল — একটা দেশ দুই ভাগে বিভক্ত

আল জাজিরার সাংবাদিকরা যখন ঢাকার চায়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর আর ব্যস্ত রাস্তায় মানুষের মুখোমুখি হলেন, তখন শুধু উদ্ধৃতি সংগ্রহ হচ্ছিল না। ধরা পড়ছিল একটা জাতির ভেতরের টানাপোড়েন — গর্ব আর বেদনার মাঝে আটকে থাকা একটা দেশ, যে দেশ এত বড় ক্রিকেট সিদ্ধান্তের মুখে আগে কখনো পড়েনি।

ঢাকা জুড়ে ১৪ জনের সঙ্গে কথা বলেছে আল জাজিরা। সাতজন সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে, তিনজন বিপক্ষে। বাকি চারজন দলীয় পরিচয় দিতে রাজি হননি, কিন্তু তারাও বয়কটকে সমর্থন জানিয়েছেন। সংখ্যাটা ছোট, কিন্তু এর ভেতরের গল্পটা অনেক বড়।

বিপক্ষের তিনজন? তারা সবাই নিজেদের শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন — সেই দলের, যার পতনের পর থেকেই এই পুরো সংকটের সূচনা। এটা কাকতালীয় নয়। এটাই সেই রাজনৈতিক বিভাজন যা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রিকেট আলোচনার নিচে চাপা পড়ে আছে।

নিরাপত্তার যুক্তি — কিন্তু বিনিময়টা কতটা ভারী?

সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টা সহজ আর আবেগের। তেজগাঁওয়ের এক চায়ের দোকানদার বিল্লাল হোসেন সরাসরি বললেন — ভারতে মুসলিমদের উপর সহিংসতা আর সীমান্তে উত্তেজনার কথা তুলে তিনি দলটাকে না পাঠানোর পক্ষেই মত দিলেন। এই অনুভূতি — সুরক্ষামূলক, উদ্বিগ্ন, সত্যিকারের ভয় থেকে জন্ম নেওয়া — এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের মূল কারণ। মানুষ ক্রিকেটের চেয়ে বড় কিছু ভাবছিল। ছেলেদের একটা অবিশ্বস্ত পরিবেশে পাঠানোর ভয়।

ঢাকার টি স্পোর্টস চ্যানেলের গবেষণা প্রধান শামীম চৌধুরী আল জাজিরাকে বললেন, আইসিসির দ্বিমুখী নীতি এবার প্রকাশ্যে এসে গেছে। বাংলাদেশ নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছিল — সেটা বৈধ ছিল। অথচ "কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকি নেই" বলে ভেন্যু পরিবর্তনে অস্বীকৃতি জানানো আইসিসির — এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্ষমতার অলিখিত নিয়মকে আরেকবার সামনে এনে দিল।

ক্রীড়া সাংবাদিক আবু যর আনসার আহমেদ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন — ঝুঁকিটা শুধু খেলোয়াড়দের না, কোচিং স্টাফ, সাংবাদিক, সমর্থক — সবার। নির্বাচন সামনে রেখে ভারতে একটা ঘটনাও ঘটলে দেশে যে আগুন জ্বলত, সেটার ভার বহন করার সামর্থ্য কারো ছিল না।

তবে পর্দার আড়ালে সাবেক বিসিবি পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলমের কণ্ঠস্বর ছিল ভিন্ন রকম — তিনি সরাসরি বলেছিলেন এটা সরকারের ক্রিকেটে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, এবং এর মাসুল ICC-র ভেতরে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে গুনতে হবে। তার কথাগুলো উড়িয়ে দেওয়া হয়নি — শুধু বড় রাজনৈতিক স্রোতের নিচে চাপা পড়ে গেছে।

যে কষ্টটার হিসাব কেউ রাখে না

ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার, এখন ক্রীড়াসামগ্রীর ব্যবসায়ী জিয়াউল হক তানিন ফেব্রুয়ারি মাসটাই সাজিয়েছিলেন বিশ্বকাপকে ঘিরে। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে বাংলাদেশ বনাম ইতালির ম্যাচের জন্য প্রিমিয়াম টিকেট কাটা ছিল — ব্যবসা, পারিবারিক সফর, আর ক্রিকেট উপভোগ একসাথে। সব পরিকল্পনা এক রাতে শেষ। অব্যবহৃত ভিসা, পড়ে থাকা টিকেট, আর এমন একটা শূন্যতা যা কোনো রাজনৈতিক যুক্তি দিয়ে পূরণ হয় না।

তানিনের গল্পটা একা তার না। সারা বাংলাদেশ জুড়ে যেসব সমর্থক মাস ধরে পরিকল্পনা করেছিলেন, টাকা জমিয়েছিলেন — তারা শেষ পর্যন্ত এমন একটা টুর্নামেন্ট দেখলেন যেখানে তাদের দল নেই।

যে তিনজন "না" বললেন — এবং কেন তাদের কথা গুরুত্বপূর্ণ

তিনজন বিরোধীকে সহজেই রাজনৈতিক সংখ্যালঘু বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সেটা হবে ভুল। বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলে এই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে অনেকেরই — শুধু এই মুহূর্তে জোরে বলার পরিবেশ নেই।

সাবেক ব্যাটার আনামুল হক বিজয় স্পষ্ট করলেন — বিশ্বকাপ একজন ক্রিকেটারের জীবনের শীর্ষবিন্দু। বেশিরভাগ খেলোয়াড় সারাজীবন এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেন। চোট বা দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে না হয়ে কূটনীতির কারণে এই স্বপ্ন হারানো — এটা ভিন্ন ধরনের অবিচার। "খেলাধুলা সবকিছুর উপরে থাকা উচিত" — তার এই কথাটা আদর্শবাদী শোনালেও, এর পেছনে আছে ক্রিকেটের জন্য গভীর ভালোবাসা।

ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক খায়রুল ইসলাম আরও পরিমাপক অবস্থান নিলেন। নিরাপত্তার উদ্বেগ তিনি উড়িয়ে দেননি — শুধু প্রশ্ন তুললেন, হুমকির মাত্রা কি যথেষ্ট যাচাই করা হয়েছিল? তৃতীয় কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুর বিকল্প কি সত্যিকার অর্থে চেষ্টা হয়েছিল?

সাবেক বিসিবি পরিচালক সৈয়দ আশরাফুল হক — যিনি দশকের পর দশক আগে বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন — বললেন প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায়: ICC-র ভেতরে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে গেছে, এই ঘটনা আরও দুর্বল করবে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব ছিল — যথেষ্ট চেষ্টা হয়নি।

দল প্রস্তুত ছিল — কিন্তু চুপ থাকতে বাধ্য হলো

এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটা রাজনীতিতে নয় — যে দলটা সব প্রস্তুতি সেরে শেষ পর্যন্ত মাঠে নামতে পারেনি, তাদের গল্পটাই আসল ব্যথা।

আল জাজিরার সঙ্গে নামপ্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা দুই জাতীয় দলের খেলোয়াড় জানালেন — ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩০টি টি-টোয়েন্টিতে ১৫টি জিতেছে, এটা তাদের ফরম্যাটে সেরা বার্ষিক পারফরম্যান্স। দলটা সত্যিকার অর্থেই তৈরি ছিল। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগটা হাতের কাছেই ছিল।

ম্যাচ ফি-র চেয়ে বড় ক্ষতির কথা বললেন তারা — ক্যারিয়ারের দৃশ্যমানতা, ফ্র্যাঞ্চাইজি সুযোগ, শীর্ষ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিজেকে যাচাই করার মঞ্চ। "এটা শুধু টাকার ব্যাপার না। এটা বড় হওয়ার সুযোগ।" — একজনের কথা।

কেউ সরকার বা বোর্ডের সমালোচনা করেননি প্রকাশ্যে। ভারত বিষয়টার কেন্দ্রে থাকায় মুখ খোলা মানেই ঝুঁকি। তাই চুপ থেকে বিশ্বকাপ হারালেন — এবং বিনিময়ে পেলেন তড়িঘড়ি সাজানো একটা তিন দলের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট, "অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপ"।

এই অদৃশ্য ক্ষতিটা কোনো জরিপের সংখ্যায় ধরা পড়ে না। কিন্তু এটা আছে, এবং থেকে যাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফাঁকা জায়গাগুলো ক্রমশ বাড়ছে — win-tk.org আগেই লিটন দাসকে ঘিরে ক্যাপ্টেনস কার্নিভালের ফটো মুহূর্তের বিশ্লেষণে যেটা উঠে এসেছিল — বাংলাদেশের উপস্থিতি বারবার পাশে সরিয়ে দেওয়ার যে ধারা, সেটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

সাবেক অধিনায়ক যা বললেন

সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল বাস্তববাদীর দৃষ্টিতে দেখলেন — আন্তর্জাতিক সফরে সরকারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক, রাজনৈতিক যন্ত্র একবার চললে বোর্ডের হাত বাঁধা থাকে। হতাশার কথা স্বীকার করলেন, বিশেষত তরুণ খেলোয়াড়দের কথা ভেবে। আর্থিক ক্ষতি সামলানো যাবে বললেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক এবং সুনামের ক্ষতিটাও সামলানো যাবে কিনা — সেটা অনুচ্চারিত রয়ে গেল।

ক্রিকেট যখন প্রক্সি যুদ্ধের মাঠ

আল জাজিরার রাস্তার জরিপ আসলে একটা গভীর সত্য ধরেছে যেটা বড় রাজনৈতিক শিরোনামে হারিয়ে যায় — বাংলাদেশের জনমত শূন্যে তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছে ২০২৪-এর আগস্টের ঘটনাবলি, জানুয়ারি ২০২৬-এ মুস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল বরখাস্ত, সীমান্তের উত্তেজনা আর বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভের মধ্যে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকট ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে — আর ক্রিকেট, দক্ষিণ এশিয়ায় যেমন প্রায়ই হয়, সেই চাপের সব ভার বহন করার মাঠে পরিণত হয়েছে। ক্রিকেট সংকট তৈরি করেনি। কিন্তু সংকটটাকে শুষে নিয়েছে।

পাকিস্তানের বয়কটের ঘোষণা আর তারপর সিদ্ধান্ত পাল্টানো — পুরো ব্যাপারটা কতটা ভঙ্গুর ছিল সেটা বুঝিয়ে দিল। কয়েকটা দিন মনে হচ্ছিল পুরো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটাই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ভারে ভেঙে পড়বে। পড়েনি — কিন্তু দাগগুলো রয়ে গেছে।

৭ বনাম ৩ — সংখ্যাটা আসলে কী বলছে

চোদ্দজনের মধ্যে সাতজন। এটা কোনো ভূমিধস নয়। এমনকি স্বস্তিদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও না — বিশেষত যখন চারজন সমর্থক নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ই দিতে রাজি হননি। আল জাজিরার জরিপ যেটা সত্যিকার অর্থে দেখাচ্ছে সেটা হলো — বাংলাদেশ একটা গভীর কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর মানুষ ভিন্ন জায়গায় এসে থামছে — কেউ নিরাপত্তার দাঁড়িপাল্লায়, কেউ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের দাঁড়িপাল্লায়।

যে তিনজন "না" বললেন — তারা দেশপ্রেমহীন নন। তাদের শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেটকে রক্ষা করার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। আর যে সাতজন "হ্যাঁ" বললেন — তারাও নির্বোধ নন। তারা এমন একটা ভয়ের জবাব দিয়েছেন যেটা বাস্তব, এবং যেটাকে রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

এই জরিপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দলটা হলো সেই চারজন — যারা দলীয় পরিচয় গোপন রেখেও বয়কটকে সমর্থন দিলেন। তারা বলছেন সিদ্ধান্তের সমর্থন কোনো একটা রাজনৈতিক শিবিরের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কিছু একটা গভীর — জাতীয় উদ্বেগ, ভারতে যাওয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট — দলনির্বিশেষে মানুষকে এক জায়গায় টেনে এনেছে।

বাংলাদেশে ক্রিকেট কখনো শুধু ক্রিকেট ছিল না। এটা পরিচয়, স্বপ্ন — আর মাঝে মাঝে এমন একটা মঞ্চ যেখানে একটা ছোট দেশ সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের অনুভব করতে পারে। এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চক্র সেই জায়গাটা কতটা ভঙ্গুর — সেটা সবাইকে মনে করিয়ে দিল। আর বুঝিয়ে দিল, রাজনীতি যখন মাঠটা নিজের কাজে লাগাতে চায় — খেলোয়াড়রা সেখানে কতটা অসহায়।

win-tk.org হলো wintk-এর একটি প্রকাশনা — যা পাঠকের কাছে সত্যিকার গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া ও সংবাদ বিশ্লেষণ পৌঁছে দেয়।