আড়াই বিলিয়ন ডলারের জরিমানা — আর বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকার ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC) ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাল। আমাজন ২.৫ বিলিয়ন ডলার গুনতে রাজি হলো। অভিযোগ ছিল: একচেটিয়া ব্যবসায়িক কৌশলে বাজার নিয়ন্ত্রণ, বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, আর ভোক্তার সার্চ ফলাফলে কারসাজি। মামলা শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে — ১৭টি রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল মিলে FTC-এর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাজন দোষ স্বীকার করেনি, কিন্তু বিচারের আগেই মিটিয়ে ফেলল।

বাংলাদেশের জন্য এটা কেবল বিদেশের খবর নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ৭৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৯ সালে ৯৬৫ কোটি ডলার হওয়ার পূর্বাভাস আছে। এই বাজারটা যখন বড় হচ্ছে, তখন একটা বড় প্ল্যাটফর্ম কীভাবে একচেটিয়া ক্ষমতা তৈরি করে — সেটা বোঝা এখনই জরুরি।

আমাজন আসলে কী করেছিল

FTC-এর অভিযোগে তিনটি কৌশলের কথা বিস্তারিত বলা হয়েছে। প্রথমটা হলো মূল্য নিয়ন্ত্রণ। আমাজনের একটি অ্যালগরিদম সারাদিন হাজারো প্রতিযোগী ওয়েবসাইটে চোখ রাখত। কোনো বিক্রেতা অন্য প্ল্যাটফর্মে কম দামে পণ্য বেচলে তার সার্চ র‍্যাংকিং আমাজনে তলানিতে চলে যেত। আমাজনের "বাই বক্স" — যেখানে ৯৮ শতাংশ কেনাকাটা হয় — সে হারাত। ফলে বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হতো।

দ্বিতীয় কৌশল ছিল Prime লজিস্টিক্স জোর করে চাপানো। Prime ছাড়া আমাজনে বিক্রি করা মানে অন্ধকারে থাকা। আর Prime পেতে হলে আমাজনের নিজস্ব ফুলফিলমেন্ট সার্ভিস (FBA) ব্যবহার করতে হবে। FBA সস্তা নয় — তার মানে বিক্রেতারা অন্য প্ল্যাটফর্মেও একই সাথে ব্যবসা করতে পারত না, খরচ বাড়ত।

তৃতীয়টা ছিল 'Project Nessie' — একটি গোপন অ্যালগরিদম যা বুঝতে পারত প্রতিযোগীরা দাম বাড়ালে অনুসরণ করবে কিনা। যখন পারত, আমাজন দাম বাড়াত এবং ধরে রাখত। এতে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত মুনাফা হয়েছে বলে FTC দাবি করেছে। মিডিয়ার নজর বাড়লে আমাজন এটা বন্ধ রাখত।

বাংলাদেশের ই-কমার্স: একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে

২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্স বার্ষিক ১১.২ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্ড-ভিত্তিক লেনদেন আগের বছরের তুলনায় ২৩.৬ শতাংশ বেড়ে ২০,৩৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবু ই-কমার্স এখনো মোট খুচরা বাজারের মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ — মানে বিশাল সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত।

প্রধান খেলোয়াড় দারাজ — আলিবাবা গ্রুপের মালিকানায়। দারাজ ৬৪ জেলায় নিজস্ব ডেলিভারি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। চালডাল অনলাইন মুদিপণ্যে এগিয়ে। পিকাবু ইলেকট্রনিক্সে। বিক্রয় ক্লাসিফাইডে। এই খাত সরাসরি হাজারো চাকরি দিচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরে আরও পাঁচ লাখ কর্মসংস্থানের পূর্বাভাস আছে।

কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন থাকছে। দারাজ একই সাথে মার্কেটপ্লেস, লজিস্টিক্স কোম্পানি, বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম, এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল খুচরার একক সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এই কাঠামো ঠিক সেটাই যা FTC আমাজনের ক্ষেত্রে চিহ্নিত করেছিল — প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভরশীল বিক্রেতাদের সাথে স্বার্থের দ্বন্দ্ব।

ইভ্যালি থেকে শিক্ষা — এবং যা শেখা হয়নি

ইভ্যালি ধসে পড়েছিল ২০২১ সালে। আগাম পেমেন্ট নিয়ে পণ্য না দেওয়া, ফান্ড তছনছ, গ্রাহকের বিশ্বাস ধ্বংস। এরপর এলো ই-অরেঞ্জ, আলেশামার্ট, ধামাকা শপিং। প্রতিটি পতন ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তারকে কয়েক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। ক্যাশ অন ডেলিভারি এখনও বাংলাদেশের ই-কমার্সের মূল পদ্ধতি — কারণ মানুষের বিশ্বাস ফিরে আসেনি পুরোপুরি।

ইভ্যালির সমস্যা ছিল প্রতারণা। আমাজনের সমস্যা ছিল একচেটিয়া ক্ষমতা। দুটো আলাদা, কিন্তু দুটোই একই শূন্যস্থান থেকে জন্মায় — প্ল্যাটফর্মের উপর কার্যকর তদারকির অনুপস্থিতি। বাংলাদেশ ডিজিটাল কমার্স পলিসি ইভ্যালির পর শক্ত হয়েছে, BTRC-এর ম্যান্ডেট বেড়েছে, কিন্তু প্ল্যাটফর্ম আধিপত্য মোকাবেলার নির্দিষ্ট কাঠামো এখনো নেই।

নীতিনির্ধারকরা কী করতে পারেন

তিনটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষা আছে। প্রথমত, অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা। আমাজনের SC-FOD বছরের পর বছর অদৃশ্যভাবে কাজ করেছে। বিক্রেতারা জানতেন না কেন তারা দৃশ্যমানতা হারাচ্ছেন। বাংলাদেশের নীতিমালায় একটি নির্দিষ্ট বাজার অংশীদারিত্বের উপরে প্ল্যাটফর্মগুলোকে প্রকাশ করতে বাধ্য করা উচিত কীভাবে সার্চ র‍্যাংকিং এবং পণ্য দৃশ্যমানতা নির্ধারণ করা হয়।

দ্বিতীয়ত, প্ল্যাটফর্ম এবং লজিস্টিক্স আলাদা রাখার নীতি। ইউরোপের Digital Markets Act ২০২৪ থেকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে — প্রধান প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের সেবাকে তৃতীয় পক্ষের চেয়ে সুবিধা দিতে পারবে না। বাংলাদেশ এখনো সেই স্তরে পৌঁছায়নি, কিন্তু কাঠামোটা এখনই তৈরি করা উচিত।

তৃতীয়ত, বিক্রেতা সুরক্ষা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দিন দিন দারাজের মতো প্ল্যাটফর্মকে প্রধান বিক্রয় চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করছেন। চুক্তির শর্ত, কমিশন হার, অভিযোগ নিষ্পত্তি, একাধিক প্ল্যাটফর্মে বিক্রির অধিকার — এই সব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার।

ভ্যাট সমস্যা এবং নীতির শূন্যস্থান

সরকার সম্প্রতি প্ল্যাটফর্ম কমিশনের উপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে বাড়িয়েছে। এটা ছোট ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে — বড় প্ল্যাটফর্মগুলো চাপ সামলাতে পারে, কিন্তু একজন গ্রামীণ তাঁতি বা ছোট উদ্যোক্তা পারেন না। একই সাথে কোনো চূড়ান্ত ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতি নেই — তার মানে ভোক্তারা বৈশ্বিক পণ্যে প্রবেশ করতে পারছেন না, এবং সরকারও সম্ভাব্য কাস্টমস রাজস্ব হারাচ্ছে।

এই দুটো সমস্যা আসলে একই সমস্যার দুই মুখ — সুসংগত ডিজিটাল বাণিজ্য নীতির অনুপস্থিতি। যেখানে এই শূন্যস্থান থাকে, সেখানে শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম নিজেরাই নিয়ম তৈরি করে।

সুযোগের জানালা এখনো খোলা

আমাজনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু থেকে অভিযোগ দাখিল পর্যন্ত ছয় বছর লেগেছিল। সেই ছয় বছরে আমাজনের বাজার অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে, বিক্রেতারা আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, প্রতিযোগীরা আরও দুর্বল হয়েছে। বাংলাদেশের কাছে এই ছয় বছর অপেক্ষার সুযোগ নেই।

এখন বাজার প্রতিযোগিতামূলক। একাধিক প্ল্যাটফর্ম আছে। বিক্রেতাদের বিকল্প আছে। এখনই সঠিক সময় — লজিস্টিক্স নিরপেক্ষতা, অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা, বিক্রেতা সুরক্ষা, এবং ক্রস-বর্ডার নীতির কাঠামো তৈরি করার। আমেরিকার ২.৫ বিলিয়ন ডলারের শিক্ষা বাংলাদেশকে বিনামূল্যে পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে — যদি আমরা সেটা কাজে লাগাই।

win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা — বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি এবং বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য বাংলা ও ইংরেজিতে সংবাদ ও বিশ্লেষণ।