কোভিডের পর সবচেয়ে দুর্বল বছর পেরিয়ে বাংলাদেশকে এখন বাড়তে হবে
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত সংখ্যাগুলো সহজ পাঠ ছিল না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৪৯ শতাংশ — কোভিড মহামারির তাৎক্ষণিক পরবর্তী সময়ের পর সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স। বিনিয়োগ কমেছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঠিক যা করার কথা তাই করেছে — সব কিছু ধীর করে দিয়েছে।
এই ভিত্তির উপরেই তারেক রহমানের নতুন সরকার দাঁড়িয়েছে। আর এই ভিত্তির বিপরীতে আইএমএফ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। সংখ্যাটি সঠিক কিনা — সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো এই লক্ষ্য অর্জনে কী করতে হবে এবং এটি ১ কোটি ৮০ লাখ বেকার বাংলাদেশির জন্য কী মানে রাখে।
জুলাই সনদ গণভোট: বাংলাদেশ কীভাবে রাষ্ট্র সংস্কারে ভোট দিল
আইএমএফ আসলে কী বলেছে — এবং কী বলেনি
৩০ জানুয়ারি ২০২৬ আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড বাংলাদেশের আর্টিকেল IV পরামর্শ সম্পন্ন করে তাদের মূল্যায়ন প্রকাশ করে। শিরোনামের সংখ্যা — ৪.৭ শতাংশ — এসেছে একটি নির্দিষ্ট শর্তসহ: "কর রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করার নীতি বাস্তবায়নের সাপেক্ষে।"
এই শর্তটি অনেক কিছু বহন করছে। এটি কী হবে তার পূর্বাভাস নয়। এটি হলো — কঠিন কাজগুলো করলে কী হতে পারে তার পূর্বাভাস। আইএমএফ স্পষ্ট করেছে কঠিন কাজগুলো কী: দুর্বল কর রাজস্ব, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, নতুন বিনিময় হার কাঠামোর অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
মূল্যস্ফীতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮.৯ শতাংশে থাকবে বলে পূর্বাভাস — সাধারণ মানুষের জন্য এখনও কষ্টকর। ২০২৬-২৭ সালে তা ৬ শতাংশে নামার আশা। মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে — তবে শুধু সংস্কার অব্যাহত থাকলে।
অন্যান্য সংস্থাগুলোও কাছাকাছি পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ৪.৮ শতাংশ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৫ শতাংশ, জাতিসংঘ ৪.৬ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার ৫.৫ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল — যা বেশিরভাগ বিশ্লেষকের কাছে আশাবাদী মনে হয়।
তিন বছরের পতন: বাংলাদেশ কীভাবে এখানে এলো
৪.৭ শতাংশের অর্থ বুঝতে হলে বাংলাদেশ কতটা পড়েছে তা জানতে হবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.১০ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে ৫.৭৮ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে ৪.২২ শতাংশ। ২০২৪-২৫ সালে ৩.৪৯ শতাংশ — কোভিডের সবচেয়ে খারাপ সময়ের কাছাকাছি।
কারণগুলো স্পষ্ট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান উৎপাদন ব্যাহত করেছে। মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঋণের খরচ বাড়িয়েছে। বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ৩০.৭০ থেকে ২৮.৫৪ শতাংশে নেমেছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে ছিল।
নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা হারাবে — এটি পোশাক রফতানিকারকদের জন্য দশকের পর দশক ধরে পাওয়া শুল্ক সুবিধা কেড়ে নেবে। সময়টা আরও কঠিন করে তুলছে পরিস্থিতি।
৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানের জন্য কী মানে
বাংলাদেশে প্রতি বছর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীতে প্রায় ২০ লাখ নতুন মানুষ যোগ হচ্ছেন। ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে কর্মসংস্থান হয় — তবে কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে বিদ্যমান কম কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জহির হুসেন বলেছেন — "ইতিবাচক লক্ষণ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। বেশি রেমিট্যান্স, রফতানি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি কমছে, বিনিময় হার স্থিতিশীল।" তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ বাড়াতে পারে।
বিএনপির ইশতেহারে ১ কোটি কর্মসংস্থান এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগচালিত অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি আছে। এগুলো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। কিন্তু বাংলাদেশের ৮ কোটি ২০ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জিডিপির সংখ্যা নয় — কর্মসংস্থান দেখছেন।
বাংলাদেশ সাইবার আইন: ৯টি ধারা বাতিল — আসলে কী বদলাল
তিনটি ঝুঁকি যা পূর্বাভাস ভেস্তে দিতে পারে
আইএমএফ তিনটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে।
প্রথমত, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম — এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। আইএমএফ বারবার রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে। অগ্রগতি ধীর।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাত। ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া ইতিমধ্যে ভঙ্গুর একটি খাতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাঁর উত্তরসূরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাহীন একজন পোশাক উদ্যোক্তা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে তাঁকে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক পরিস্থিতি। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন — মার্কিন শুল্ক নীতি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমাচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক খাত সরাসরি প্রভাবিত। মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কমলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিও কমবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪.৭ শতাংশের মানে
বিনিয়োগকারীদের কাছে আইএমএফের ৪.৭ শতাংশ পূর্বাভাস উদ্বেগজনকও নয়, উত্তেজনাপূর্ণও নয়। এটি কঠিন বছর থেকে ফেরার সংকেত — তবে ঐতিহাসিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি বাস্তবায়নের শর্তে।
সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। শক্তিশালী সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার এসেছে। ২০২৪-২৫ সালের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমেছে। আইএমএফ কর্মসূচি সক্রিয়। রেকর্ড রেমিট্যান্স পারিবারিক ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীল রাখছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২,৭৬৯ ডলার। বর্তমান মূল্যে জিডিপি ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। তরুণ, ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তি অক্ষুণ্ণ।
৪.৭ শতাংশ মেঝে — সিলিং নয়। মধ্যমেয়াদে ৬ শতাংশের কাছাকাছি যাওয়া নির্ভর করছে আগামী বারো মাসের সিদ্ধান্তের উপর: ব্যাংকিং সংস্কার, রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবে রূপ নেয় কিনা।
বাংলাদেশের ৮ কোটি ২০ লাখ নেটিজেনের জন্য এটি বিমূর্ত প্রশ্ন নয়। এটি প্রশ্ন — আগামী পাঁচ বছর কি শেষ তিন বছরের মতো হবে, নাকি তার আগের দশকের মতো?
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়ে স্বাধীন সংবাদের জন্য ভিজিট করুন win-tk.org। যোগাযোগ: editor@win-tk.org