যে সংখ্যাটা বাড়তেই থাকছে
২০২৪–২৫ অর্থবছর ছিল মাইলফলক: বাংলাদেশ ৩০.০৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে — প্রথমবারের মতো ৩০ বিলিয়নের সীমা অতিক্রম। এর আগের বছরের তুলনায় ২৫.৫% বৃদ্ধি। তারপর এফওয়াই২৬ শুরু হলো — এবং রেকর্ড ভাঙা থামলো না।
জুলাই ২০২৫: ২.৪৭ বিলিয়ন ডলার। আগস্ট: ২.৪২ বিলিয়ন। সেপ্টেম্বর: ২.৬৮ বিলিয়ন। অক্টোবর: ২.৫৬ বিলিয়ন। নভেম্বর: ২.৮৮ বিলিয়ন। ডিসেম্বর ২০২৫: ৩.২২ বিলিয়ন — ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাস। জানুয়ারি ২০২৬: ৩.১৭ বিলিয়ন — তৃতীয় সর্বোচ্চ। ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২২.২৫ বিলিয়ন ডলার — গত বছরের একই সময়ের ১৮.২৪ বিলিয়নের তুলনায় ২১.৮% বেশি।
এই গতি জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে পূর্ণ বছরের রেমিট্যান্স ৩৫–৩৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে — দেশের পোশাক রফতানির সমতুল্য একটিমাত্র খাত থেকে। প্রেক্ষাপট: ১৯৭৪–৭৫ সালে বাংলাদেশ মাত্র ১ কোটি ১৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছিল। পঞ্চাশ বছরে সেই অঙ্ক ৩০ বিলিয়নে পৌঁছানো আধুনিক উন্নয়নের ইতিহাসে সত্যিকারের বিরল রূপান্তর।
বিকাশ বনাম নগদ বনাম রকেট ২০২৬: কোন মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ সেরা?
১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ যাদের পাঠানো টাকায় বাংলাদেশ চলে
এই সংখ্যার পেছনে আছেন মানুষ। ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছেন — গালফ রাষ্ট্রগুলো, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং আরও অনেক দেশে। সৌদি আরব সবচেয়ে বড় উৎস, তারপর আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত ও মালয়েশিয়া।
অভিবাসীদের বেশিরভাগ স্বল্প ও আধা-দক্ষ শ্রমে নিয়োজিত: রিয়াদ ও দুবাইয়ে নির্মাণ শ্রমিক, ওমান ও কুয়েতে গৃহকর্মী, মালয়েশিয়ায় কারখানা শ্রমিক। ২০২৩ সালে রেকর্ড ১৩ লাখ বাংলাদেশি বিদেশ গেছেন। অনেকে যাওয়ার আগে বড় রিক্রুটমেন্ট ফি দেন যা ফেরত পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
বছর বছর যা পরিবর্তন হয় তা প্রবাসীর সংখ্যা নয় — বরং তারা কত পাঠাচ্ছেন এবং কোন পথে। ২০২৪–২৬-এর উত্থান মূলত চ্যানেল বদলের গল্প, অভিবাসন বৃদ্ধির নয়।
কেন এত বাড়ল: চারটি কারণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান চারটি কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করেছেন — এবং তথ্য-প্রমাণ সবগুলোকেই সমর্থন করে।
প্রথমত, আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে আস্থা ফিরে আসা। আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর — যখন শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয় এবং মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে — অনেক প্রবাসী যারা আগে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসের কারণে হুন্ডিতে পাঠাতেন, তারা আবার ব্যাংক চ্যানেলে ফিরে আসেন।
দ্বিতীয়ত, আরও বাজারমুখী বিনিময় হার। বছরের পর বছর বাংলাদেশ কৃত্রিম বিনিময় হার বজায় রেখেছিল, যা সরকারি ব্যাংক রেট ও কার্বমার্কেট রেটের মধ্যে ফারাক তৈরি করত। ব্যাংক চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্সে প্রবাসীরা কম টাকা পেতেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ফারাক দূর করায় ব্যাংকিং চ্যানেল সরাসরি আর্থিকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, ২.৫% নগদ প্রণোদনা। প্রতি ১০০ ডলারে আড়াই ডলার ইনসেন্টিভ চ্যানেল বদলে ছোট কিন্তু বাস্তব প্রণোদনা দিচ্ছে।
চতুর্থত, গালফ শ্রম বাজারের সম্প্রসারণ। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০, আমিরাতের নির্মাণ কার্যক্রম এবং কাতারের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষিণ এশীয় শ্রমের চাহিদা উঁচুতে রেখেছে। মজুরি ও কর্মসংস্থান স্থিতিশীল থাকায় প্রেরণের পরিমাণও স্থিতিশীল।
২২ বিলিয়ন ডলার আসলে কী করে
সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব বিশাল। রেমিট্যান্স এখন বাংলাদেশের জিডিপির ৬.৫৭% এবং আমদানি ব্যয়ের প্রায় ৪৭% মেটাচ্ছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪.৫৪ বিলিয়ন ডলার — ২০২২–২৩-এর ২০ বিলিয়নের সংকট থেকে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার। বাংলাদেশ ব্যাংক এফওয়াই২৬-এর প্রথম ৮ মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫.৪৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা মূলত রেমিট্যান্স-চালিত।
পরিবার পর্যায়ে: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী রেমিট্যান্সের ৩২.৮১% খাদ্য ব্যয়ে, ৩২.৮২% অন্য দৈনন্দিন খরচে, ১৮.৮৪% জমি ও টেকসই পণ্যে, ১৩.৭৪% সঞ্চয়ে এবং ৩৩.৪৫% বিনিয়োগে যায়।
বাস্তবে: রিয়াদে কর্মরত গার্মেন্ট শ্রমিক প্রতি মাসে গাজীপুরের পরিবারে ২৫,০০০ টাকা পাঠাচ্ছেন — বাড়িভাড়া, বোনের টিউশন ফি, আর একটু একটু করে জমির দিকে এগোনো। ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিকের এই লেনদেন মিলিয়ে যে অদৃশ্য পারিবারিক কল্যাণ অবকাঠামো তৈরি হয়, কোনো সরকারি বাজেট তা একা পূরণ করতে পারে না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ২০২৬: ডিএসইএক্স ৪৬% বৃদ্ধি — সত্যিকারের পুনরুদ্ধার নাকি র্যালির উত্তেজনা?
হুন্ডি সমস্যা — এবং কেন এটা কমছে
হুন্ডি — অনানুষ্ঠানিক হাওয়ালাভিত্তিক অর্থ স্থানান্তর নেটওয়ার্ক — দশকের পর দশক ধরে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি চলেছে। অর্থনীতিবিদরা অনুমান করেন মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের ৩০–৫০% হুন্ডির মাধ্যমে আসত।
হুন্ডি কাজ করে কারণ এটি দ্রুত (অনেক ক্ষেত্রে একই দিনে ডেলিভারি), সস্তা (প্রায়ই শূন্য দৃশ্যমান ফি) এবং গোপনীয়। দুবাইয়ের শ্রমিক ব্রোকারকে নগদ দেন; ঢাকার সদরঘাট বা সিলেটের বাস স্ট্যান্ডে সমতুল্য টাকা পরিবারকে পৌঁছায় — কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, নথি বা ট্রেসেবল লেনদেন ছাড়াই।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হওয়া দমন দুইভাবে হুন্ডির আপেক্ষিক সুবিধা কমিয়েছে: প্রথমত, লাইসেন্সবিহীন অপারেটরদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও কার্ব মার্কেট রেটের মিলন — যখন ব্যাংক রেট কার্ব রেটের কাছাকাছি, তখন ঝুঁকি হিসাব করে বেশিরভাগ শ্রমিকের কাছে ব্যাংকই সেরা বিকল্প হয়ে ওঠে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন: ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে এসেছে এবং প্রবাসীরা এখন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে পাঠাচ্ছেন।
রেকর্ডের নিচে যে কাঠামোগত দুর্বলতা লুকিয়ে
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স গল্পের একটি ছায়া দিক আছে যা প্রতিটি রেকর্ড হেডলাইন আড়াল করে। ইস্ট এশিয়া ফোরামের অর্থনীতিবিদরা দেশের প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরতাকে সম্ভাব্য "রেমিট্যান্স ট্র্যাপ" বলে সতর্ক করেছেন।
রেমিট্যান্সের বেশিরভাগই উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বদলে ভোগ ও জমি ক্রয়ে যায়। মুন্সীগঞ্জে জমি কিনলে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়, কিন্তু সেটা কর্মসংস্থান তৈরি করে না বা রফতানি সক্ষমতা বাড়ায় না। সরকার ডায়াসপোরা বন্ড এবং রেমিট্যান্স-সংযুক্ত সঞ্চয় পণ্যের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবায়ন ধীর।
দক্ষতার কাঠামোও সমস্যা। বাংলাদেশের অভিবাসন প্রোফাইল নিম্ন ও আধা-দক্ষ কাজে কেন্দ্রীভূত। গালফ নির্মাণ ও গৃহকর্মী চাকরি স্বয়ংক্রিয়করণ এবং গন্তব্য দেশের নীতি পরিবর্তনের ঝুঁকিতে। সৌদির ভিশন ২০৩০ চিরকাল চলবে না। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ রয়েছে — কিন্তু অগ্রগতি ধীর।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬: এখনকে জন্য সংখ্যাগুলোর মানে
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের জন্য রেমিট্যান্স উত্থান একটি সম্পদ এবং একটি সতর্কতা।
সম্পদ: ৮ মাসে ২২.২৫ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ৩৪.৫৪ বিলিয়নে পুনর্গঠন করেছে, টাকাকে স্থিতিশীল করেছে, রফতানির দুর্বলতা কাটিয়েছে এবং আইএমএফের সাথে আলোচনায় আপেক্ষিক শক্তির জায়গা দিয়েছে।
সতর্কতা: এই প্রবাহ আংশিক কাঠামোগত (বেশি প্রবাসী আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে পাঠাচ্ছেন) এবং আংশিক চক্রাকার (গালফ শ্রম বাজার এখন ভালো, হুন্ডি দমন সাম্প্রতিক, আস্থা ভঙ্গুর)। ২৫ ফেব্রুয়ারি নিযুক্ত নতুন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর — কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাহীন — এই নীতি পরিবেশ ধরে রাখতে পারবেন কিনা, সেটাই মূল প্রশ্ন।
কিন্তু চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল বা রংপুরে যে পরিবার বিদেশ থেকে টাকার অপেক্ষায় আছে, তাদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা কোনো বিষয় নয়। তাদের কাছে বিষয় হলো: টাকাটা কি সঠিক সময়ে, ন্যায্য দামে, কম চার্জে পৌঁছাবে? সে হিসাবে ২০২৬ ভালোই চলছে।
win-tk.org একটি WinTK প্রকাশনা। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও রেমিট্যান্স নীতির স্বাধীন সংবাদের জন্য ভিজিট করুন win-tk.org। যোগাযোগ: editor@win-tk.org