ব্রেক্সিট কীভাবে বাংলাদেশের সেরা বাণিজ্য সুযোগ হয়ে উঠল

২০২১ সালের জানুয়ারিতে যখন যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক বাজার ছেড়ে বেরিয়ে গেল, তখন সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম ছিল খাদ্যসংকট, খালি সুপারমার্কেটের তাক, ডোভার-ক্যালাইতে নতুন বাণিজ্যিক বাধার বিশৃঙ্খলা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের চোখে এই গল্পটা ঢাকা থেকে একেবারে ভিন্ন দেখাচ্ছিল।

ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যকে শূন্য থেকে নিজের বাণিজ্য কাঠামো তৈরি করতে বাধ্য করেছিল। আর সেটা করতে গিয়ে লন্ডন এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা বাংলাদেশকে ব্রিটিশ বাজারে ইইউ আমলের চেয়ে আরও অনুকূল অবস্থানে রেখেছে। কেন — সেটা বুঝতে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাণিজ্যনীতির কলকব্জা এবং বাংলাদেশের কাঠামোগত সুবিধাগুলো দুটোকেই দেখতে হবে।

সংখ্যার গল্প: ৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারের বাজার

বাংলাদেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে ৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে — যা বাংলাদেশের মোট আরএমজি রপ্তানি আয়ের ১১.০৫ শতাংশ। মোট রপ্তানি ছিল ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.৮৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পর যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য।

দশকের ট্র্যাজেক্টরি আরও বলিষ্ঠ কথা বলে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০০০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যে ছিল মাত্র ৫০০ মিলিয়ন ডলার — ২০২২-২৩ অর্থবছরে সেটা ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন যুক্তরাজ্যের মোট পোশাক আমদানির ২৩ শতাংশ মূল্যে এবং ২৮ শতাংশ পরিমাণে সরবরাহ করছে। মূল্য প্রতিযোগিতায় সুবিধা কাঠামোগত — বাংলাদেশি পোশাক ভারত ও চীনের তুলনীয় পণ্যের চেয়ে ২১-৩২ শতাংশ সস্তা।

ডিসিটিএস: আগের চেয়ে ভালো যে কাঠামো

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের বাজার প্রবেশাধিকারের মূল ভিত্তি হলো ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম (ডিসিটিএস), যা ব্রিটিশ সরকার ২০২৩ সালের জুনে চালু করেছে।

ডিসিটিএস একাধিক মানদণ্ডে পূর্ববর্তী কাঠামোর চেয়ে বেশি উদার। এটা বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ রপ্তানিতে — তৈরি পোশাক সহ — শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরেও সেই সুবিধা বজায় রাখে। ডিসিটিএসের অধীনে বাংলাদেশ ২০২৯ সালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনহ্যান্সড প্রেফারেন্সেস স্তরে যাবে — এলডিসি উত্তরণের পরেও ৯৮ শতাংশ রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে।

ঢাকায় ব্রিটিশ হাই কমিশনের একটি গবেষণা অনুমান করেছে যে ডিসিটিএস বাংলাদেশকে বার্ষিক ৩১৫ মিলিয়ন পাউন্ড শুল্কে সাশ্রয় করাবে। র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের গবেষণা প্রজেকশন করেছে যে ডিসিটিএস কাজে লাগাতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের যুক্তরাজ্য রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।

পণ্যের উৎস বিধির উন্নতিটাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের ৯৫টি দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে তৈরি পোশাক যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্তভাবে পাঠাতে পারে। এই বিস্তৃত কিউমুলেশন বিধান বাংলাদেশি উৎপাদকদের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ইইউ আমলের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়তা দেয়।

ব্রেক্সিটের বিশৃঙ্খলা যে দরজা খুলে দিল

আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য কাঠামোর বাইরে, ব্রেক্সিটের বিঘ্নকারী প্রভাব যুক্তরাজ্যের খুচরা সরবরাহ শৃঙ্খলে এমন কাঠামোগত সুযোগ তৈরি করেছে যা কোনো বাণিজ্য স্কিম একা তৈরি করতে পারত না।

ব্রেক্সিটের আগে অনেক ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা ইউরোপীয় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পোশাক সংগ্রহ করত। ২০২১ সালের পর যুক্তরাজ্য-ইইউ সীমান্তে নতুন শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক বাধা এই সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যয়বহুল ও অবিশ্বস্ত করে তুলল। ব্রিটিশ খুচরা প্রতিষ্ঠানগুলো — প্রাইমার্ক, নেক্সট, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার — সরাসরি উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে সোর্সিং সম্পর্ক গড়ার শক্তিশালী প্রণোদনা পেল। বাংলাদেশ ছিল স্বাভাবিক গন্তব্য।

বিজিএমইএ ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের পোশাক শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে মূলত মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে — এবং পূর্ববর্তী সোর্সিং প্যাটার্ন বিঘ্নিত হওয়া বাংলাদেশি উৎপাদকদের সঙ্গে ব্রিটিশ ক্রেতাদের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়েছে।

ভারত-যুক্তরাজ্য এফটিএ: যে চ্যালেঞ্জ সব বদলে দিচ্ছে

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী। এবং ২০২৫ সালে এটা এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর প্রতিযোগিতামূলক হুমকির মুখে।

ভারত ও যুক্তরাজ্য একটি যুগান্তকারী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে — ভারতের ৯৯ শতাংশ রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, টেক্সটাইল ও পোশাক সহ। ভারত এতদিন যে শুল্ক দিয়ে যুক্তরাজ্যে পোশাক পাঠাত এবং বাংলাদেশ সেই শুল্ক ছাড়াই পাঠাত — সেই পার্থক্যটা এখন শেষ হয়ে গেল।

বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন ভারত-যুক্তরাজ্য এফটিএ মধ্যমেয়াদে ভারতের যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানি ১০-১৫ শতাংশ বাড়াতে পারে। ভারতের লালভাই গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান কুলিন লালভাই সরাসরি বলেছেন বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশের বাইরে বিকল্প উৎস খোঁজতে উৎসাহিত করছে।

এলডিসি উত্তরণের পরে ডিসিটিএসের নিয়মও কঠিন হবে। বর্তমানে "সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফর্মেশন" — মানে বিদেশি কাপড় আমদানি করে পোশাক তৈরি করলেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যায়। উত্তরণের পর "ডাবল ট্রান্সফর্মেশন" দরকার হবে — দেশীয় সুতা ব্যবহার করতে হবে। এটা দেশীয় টেক্সটাইল সক্ষমতায় বিনিয়োগের দাবি রাখে।

বাংলাদেশ কী করছে এবং কী করতে হবে

বিজিএমইএ এবং ইপিবি বেশ কয়েকটি কৌশলগত অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছে।

পণ্য বৈচিত্র্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক লিভার। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে মৌলিক নিটওয়্যার ও উভেন গার্মেন্টে কেন্দ্রীভূত — যেখানে মূল্য প্রতিযোগিতা নির্ধারক। ম্যান-মেড ফাইবার পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যে উত্তরণ বিশুদ্ধ মূল্য প্রতিযোগিতার ঝুঁকি কমাবে। বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান নিশ্চিত করেছেন ম্যান-মেড ফাইবারে বৈচিত্র্যায়ন ইতিমধ্যে চলছে।

দেশীয় টেক্সটাইল সক্ষমতায় বিনিয়োগ কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা। ডাবল ট্রান্সফর্মেশন শর্ত পূরণে দেশীয় সুতা ও কাপড়ের সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা ব্যয়বহুল কিন্তু অপরিহার্য। বড় উৎপাদক গ্রুপগুলো এই বিনিয়োগ শুরু করেছে — প্রশ্ন হলো গতি যথেষ্ট কিনা।

শ্রম অধিকার ও গভর্ন্যান্স সম্মতির বিষয়টি ডিসিটিএস কাঠামোয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্পষ্ট বলেছেন যুক্তরাজ্য মানবাধিকার, শ্রম মান ও দুর্নীতি-বিরোধী বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা বিপর্যয়ের পর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকারে বাংলাদেশের যে বিনিয়োগ, সেটা শুধু নৈতিক প্রশ্ন নয় — এটা বাজার প্রবেশাধিকারের শর্ত।

কৌশলগত চিত্র: সুযোগ ও ঝুঁকির সংগম

বাংলাদেশের পোশাক খাত একটি জটিল কৌশলগত পরিবেশে চলছে। ইইউ — যেখানে এফওয়াই২৫-এ ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলারের ৫০ শতাংশেরও বেশি রপ্তানি যায় — নতুন জিএসপি কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র — যেখানে ৭.৫৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি যায় — শুল্ক নীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ভারত-যুক্তরাজ্য এফটিএ তৃতীয় বৃহত্তম বাজারে নতুন প্রতিযোগিতামূলক চাপ দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের ডিসিটিএস কাঠামো যা আছে তাই: এলডিসি উত্তরণ পার করতে পারে এমন অন্যতম সেরা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা। ৩১৫ মিলিয়ন পাউন্ড বার্ষিক শুল্ক সাশ্রয়, ২০৩০ সালে ১১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সম্ভাবনা, ব্রেক্সিট-পরবর্তী পুনর্গঠনে গড়া সরাসরি সোর্সিং সম্পর্ক — এগুলো বাস্তব লাভ।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের উৎপাদক ও নীতিনির্ধারকরা — পণ্য বৈচিত্র্য, দেশীয় টেক্সটাইল বিনিয়োগ, সম্মতি অবকাঠামোয় — যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছেন কিনা। ব্রেক্সিট যা দিয়েছে সেটা ধরে রাখতে এবং বিস্তার ঘটাতে — প্রতিযোগিতার পরিবেশ আবার পরিবর্তিত হওয়ার আগেই।

win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধটি তথ্যমূলক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ উদ্দেশ্যে আমাদের সম্পাদকীয় দলের দ্বারা তৈরি।