যে ঋণ আর ফেরেনি
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাত্র পনেরো মাস পরেই দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি সংকটে পড়ে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালিত সম্পদমান পর্যালোচনায় — বিদেশি অডিট প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় — যা উঠে এল তা আর চাপা দেওয়ার উপায় ছিল না: গ্রুপটি এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছে, যার বেশির ভাগ কখনো ফেরত আসবে না। এই জালিয়াতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না — এটি ছিল একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখন এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা — মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলো কেবল হিসাবরক্ষণের সংকট নয়। এগুলো দেড় দশকের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত কর্পোরেট জালিয়াতি, নিয়ন্ত্রক দখল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার আর্থিক দলিল।
ওয়্যারকার্ড, এনরন এবং কর্পোরেট জালিয়াতির ছক
বৃহৎ পরিসরে কর্পোরেট জালিয়াতি সবসময় একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ করে। জার্মান পেমেন্টস কোম্পানি ওয়্যারকার্ড এজি ২০২০ সালের জুনে ধসে পড়ে, স্বীকার করে যে তাদের ব্যালেন্স শিটে দেখানো ১.৯ বিলিয়ন ইউরো নগদ অর্থ আদতে অস্তিত্বহীন। বছরের পর বছর নিরীক্ষকরা জালিয়াতির হিসাবে স্বাক্ষর করে গেছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রতিক্রিয়া জানাতে ধীর ছিল। জার্মানির বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপক ডিডব্লিউএস গ্রুপ যখন ২০২১ সালে ওয়্যারকার্ড প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা করে, তখন বিষয়টি স্পষ্ট হয় — প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এমন আর্থিক বিবরণীর উপর নির্ভর করেছিলেন যা মৌলিক দেউলিয়াত্ব আড়াল করেছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালে এনরনের পতনও একই সাক্ষ্য দেয়। এনরন অফ-ব্যালেন্স শিট হিসাবের মাধ্যমে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি দায় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। এই কাঠামো যখন ভেঙে পড়ল, তখন কর্মীদের পেনশন তহবিল মুছে গেল এবং সরাসরি ২০০২ সালের সারবানেস-অক্সলি আইন প্রণীত হলো — যা এক প্রজন্মে মার্কিন কর্পোরেট প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সংস্কার। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকটের কাঠামো একই রকম — পার্থক্য শুধু এটুকু যে এখানে গোপনের হাতিয়ার ছিল ডেরিভেটিভ বা অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার নয়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্য: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা আর্থিক হাতিয়ার হিসেবে
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) অনুমান করেছে, ২০০৮ সাল থেকে ২৪টি বড় ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলার কর্মসূচির শর্তে আন্তর্জাতিক ঋণ শ্রেণিবিন্যাস মান প্রয়োগের পর প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবে আরও বেশি।
কৌশলটি সহজ ছিল। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে বেসরকারি ও ইসলামিক ব্যাংকগুলোর মালিকানা নিয়ে নেয়। বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে তারা নিজেদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ঋণ পাঠাতে থাকে — সামান্য জামানতে, ফুলিয়ে ফাঁপানো প্রকল্প মূল্যায়নে। একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার বর্ণনা দিয়েছেন: ৪৫০ কোটি টাকার এলপিজি প্রকল্পের জন্য দেওয়া হতো ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ। বাড়তি অর্থ সরিয়ে নেওয়া হতো — জমি কেনায়, বিলাসবহুল গাড়িতে, বিদেশে অর্থ পাচারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মুদ্রানীতি বিবৃতি অনুমান করেছিল মধ্যবর্ষ নাগাদ খেলাপি ঋণ মোট বকেয়ার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। সেটি হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে এনপিএল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়, যার ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ — ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা — 'মন্দ ঋণ' হিসেবে চিহ্নিত, যার জন্য শতভাগ প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এই প্রভিশনিং বাধ্যবাধকতা ডজনখানেক ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কার্যত স্থগিত করে দিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির পরিসর
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দশটি ব্যাংক সমগ্র খাতের ৭১ শতাংশ খেলাপি ঋণ ধারণ করছে। এই কেন্দ্রীভবন বলে দেয় যে জালিয়াতি ছিল লক্ষ্যনির্দিষ্ট, বিচ্ছিন্ন নয়। জনতা ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ আজ খেলাপি — ৯৪ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকার মধ্যে ৭০ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা — যার পেছনে মূলত অ্যানন্টেক্স, ক্রিসেন্ট, বেক্সিমকো, থার্মাক্স এবং এস আলম গ্রুপের সম্মিলিত ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ।
ইসলামী ব্যাংকের এনপিএল ২০২৩ সালের ৬ হাজার ৯১৯ কোটি থেকে ২০২৫ সালের মার্চে ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় উঠেছে। ব্যাংকটির মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৮০ শতাংশেরও বেশি এস আলম গ্রুপ এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে গেছে। ইউনিয়ন ব্যাংকে — যেটিও এস আলম নিয়ন্ত্রিত ছিল — বকেয়া ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ এখন খেলাপি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই গ্রুপের আগে নিয়ন্ত্রণাধীন পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ শুরু করেছে — যেসব প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপির হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
আইএফআইসি ব্যাংকে — যেখানে সালমান এফ রহমান চেয়ারম্যান ছিলেন — মন্দ ঋণ ২০২৪ সালের জুনের ৩ হাজার ৭৫৬ কোটি থেকে ২০২৫ সালের মার্চে ২৫ হাজার ৯৭১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ৫ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকার জালিয়াতি, আত্মসাৎ এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে ১১টি মামলা দায়ের করেছে। ২০২৪ সালের শেষে ১৯টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় — রেকর্ড উচ্চতায়।
ব্যাংকিং সংকট অর্থনীতিতে যা করে
এই অবস্থায় একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিণতি বিমূর্ত নয়। শ্রেণিকৃত ঋণ বাড়লে প্রভিশনিং সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা ব্যাংকের মুনাফা কমায় এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত করে। তদুপরি, তীব্র এনপিএল চাপের মুখে থাকা ব্যাংকগুলো পুঁজি সরকারি ট্রেজারি বন্ডে সরিয়ে নিচ্ছে — একটি নিশ্চিত, ঝুঁকিমুক্ত উপকরণ — বেসরকারি খাতে কার্যকরী মূলধন বা প্রকল্প ঋণ না দিয়ে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কৃষিবহির্ভূত কর্মসংস্থানের সিংহভাগ এসএমই নির্ভরশীল, এবং তারা ব্যাংক ঋণের উপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নির্ভরশীল। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি সরাসরি বলেছেন: যে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে ২০ টাকা মন্দ ঋণ আছে সে ব্যাংক ২০ টাকা প্রভিশন রাখতে বাধ্য — নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সেটুকুই কমে যায়। যেখানে ৩৫ শতাংশ ঋণ শ্রেণিকৃত, সেখানে এই ঋণ-ঘাটতি কাঠামোগত রূপ নেয়।
নরওয়ের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল বাংলাদেশে বিনিয়োগ কমিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্লু-চিপ অবস্থান থেকে বেরিয়ে গেছে — একটি পরিশীলিত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর দেশ ঝুঁকি সম্পর্কে উদ্বেগের স্পষ্ট সংকেত। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও নতুন বাধার মুখে পড়েছে।
জবাবদিহির ফাঁক এবং আইএমএফ চাপ
আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ নিয়েছে। আইএমএফ কর্মসূচির শর্ত মেনে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে — মেয়াদি ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিনে নামিয়েছে, বাসেল-৩ নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত সম্পদমান পর্যালোচনা বছরের পর বছর ধরে আড়াল করা খেলাপিগুলো উন্মোচন করেছে। মানি লোন কোর্ট অর্ডিন্যান্স ২০২৫ এবং দেউলিয়া ও দেউলিয়াত্ব অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর খসড়া তৈরি হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঁচটি নতুন অর্থঋণ আদালত স্থাপন করা হয়েছে।
ওয়্যারকার্ড ও এনরনের দৃষ্টান্ত একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা দেয়: কেলেঙ্কারির পরে প্রণীত সংস্কার আর কেলেঙ্কারির জন্য জবাবদিহি একই জিনিস নয়। জার্মানিতে ওয়্যারকার্ডের পতনের ফলে বাফিন পুনর্গঠিত হয়েছিল এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এনরন সারবানেস-অক্সলি আইন এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাজা এনেছিল। সেই বিচারগুলোর প্রতিরোধমূলক প্রভাব পরের দুই দশক কর্পোরেট প্রশাসনের আচরণ গড়ে দিয়েছিল।
সংস্কারের অপরিহার্যতা: উন্মোচন থেকে প্রতিরোধে
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকিং সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য জাহিদ হোসেন সরাসরি বলেছেন: এনপিএল সমস্যা নতুন নয়, এটি লুকানো ছিল। ২০২৪-পরবর্তী রূপান্তর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সংকট তৈরির কাঠামোগত শর্তগুলো — নিয়ন্ত্রক দখল, রাজনৈতিক ঋণ, অপর্যাপ্ত জামানত প্রয়োগ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দায়মুক্তি — এখনো পুরোপুরি ভাঙা হয়নি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ এনপিএল অনুপাতে এশিয়ায় প্রথম। ভারতের এনপিএল হার ১ দশমিক ৭ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার ০ দশমিক ২ শতাংশ। সেসব সংখ্যা আর বাংলাদেশের ৩৫ শতাংশের মধ্যে ব্যবধান অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ঘাটতি নয় — এটি পনেরো বছর ধরে রাজনৈতিক দখলে পরিচালিত পদ্ধতিগত জালিয়াতির মূল্যের পরিমাপ।
বৈশ্বিক কর্পোরেট জালিয়াতির কেলেঙ্কারিগুলো থেকে যে মূল শিক্ষা পাওয়া যায় তা একটি নীতিতে মিলিত হয়: জবাবদিহি ছাড়া প্রকাশ স্থায়ী সংস্কার নয়, সাময়িক বিব্রততা মাত্র। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন তাদের প্রকৃত ব্যালেন্স শিট দেখাচ্ছে। কঠিন কাজটি এরপর — অর্থ উদ্ধার, দায়ীদের বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা পুনর্নির্মাণ, এবং রাজনৈতিক নৈকট্যের বদলে ঝুঁকির ভিত্তিতে পুঁজি বরাদ্দকারী একটি ঋণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা — এটি পরবর্তী এক দশকের কাজ।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধটি তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের জন্য পাঠকদের প্রাথমিক উৎস ও আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে।