ঢাকা মেট্রোরেল এমআরটি লাইন ৬: রুট, স্টেশন, ভাড়া ও ২০২৬ আপডেট

ঢাকায় যানজট মানে শুধু দেরি নয় — এটি জীবনের একটি অংশ হয়ে গিয়েছিল। উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে স্বাভাবিক দিনে দুই ঘণ্টা, খারাপ দিনে তিন ঘণ্টাও লেগে যেত। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে সেই হিসাব বদলে গেছে। ঢাকা মেট্রোরেল — এমআরটি লাইন ৬ — একই দূরত্ব পার করে ৩৫ থেকে ৪০ মিনিটে, রাস্তার যানজটের উপর দিয়ে উঁচু ট্র্যাকে।

প্রতিদিন সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি যাত্রী এই মেট্রোতে চড়ছেন। এই গাইডে আছে সম্পূর্ণ রুট, সব ১৬টি স্টেশনের তালিকা, পুরো ভাড়ার কাঠামো, সময়সূচি, টিকিট পদ্ধতি এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট — কমলাপুর এক্সটেনশনের অগ্রগতি সহ।

মিয়ানমার গণহত্যা মামলা আইসিজে ২০২৬: রোহিঙ্গার বিচার কোথায়

রুট: উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল

এমআরটি লাইন ৬ সম্পূর্ণ উড়াল পথে ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ বরাবর চলে। উত্তরার উত্তরপ্রান্ত থেকে শুরু হয়ে মতিঝিলের বাণিজ্যিক কেন্দ্রে শেষ হয় — মোট দূরত্ব ২০.১ কিলোমিটার। পুরো পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ মিনিট।

লাইনটি দুই ধাপে চালু হয়েছে। প্রথম ধাপ — উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও — ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর। দ্বিতীয় ধাপ — আগারগাঁও থেকে মতিঝিল — ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর। তৃতীয় ধাপে মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত আরও ১.১৬ কিলোমিটার বাড়ানো হবে — লক্ষ্য ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি উদ্বোধন।

লাইনটি জাপানি প্রকৌশল মানদণ্ডে নির্মিত, জাইকার অর্থায়নে। মোট নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতি কিলোমিটার হিসেবে এটি এশিয়ার অন্যতম ব্যয়বহুল দ্রুতগামী গণপরিবহন প্রকল্প।

১৬টি স্টেশন: উত্তর থেকে দক্ষিণ সম্পূর্ণ তালিকা

১. উত্তরা উত্তর (দিয়াবাড়ি) — উত্তর টার্মিনাল। উত্তরার দিয়াবাড়ি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন।

২. উত্তরা সেন্টার — উত্তরা মডেল টাউনের বাণিজ্যিক ও আবাসিক কেন্দ্র। স্কুল, অফিস ও বাজারের কারণে যাত্রীসংখ্যা বেশি।

৩. উত্তরা দক্ষিণ — উত্তরার দক্ষিণ অংশ কভার করে, পুরো উত্তরা জোনে মেট্রো পরিষেবা সম্পূর্ণ করে।

৪. পল্লবী — মিরপুর করিডোরের প্রবেশমুখ। পশ্চিম ঢাকায় যাওয়ার বাস রুটের সাথে সংযোগ।

৫. মিরপুর ১১ — মিরপুর ১১ এলাকার যাত্রীদের জন্য। আশেপাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা।

৬. মিরপুর ১০ — লাইনের সবচেয়ে ব্যস্ত স্টেশনগুলোর একটি। মিরপুর ১০ গোলচত্বরের কাছে, শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশে।

৭. কাজীপাড়া — কাজীপাড়া ও আশেপাশের মিরপুর এলাকার আবাসিক যাত্রীদের সেবায়।

৮. শেওড়াপাড়া — শেওড়াপাড়া এলাকার সাথে কেন্দ্রীয় ঢাকার সংযোগ দেয়।

৯. আগারগাঁও — গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফার স্টেশন। জাতীয় পরিচয়পত্র অফিস, সরকারি মন্ত্রণালয় এবং এনআইসিভিডি হাসপাতালের কাছে। ২০২২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এটাই ছিল দক্ষিণ টার্মিনাল।

১০. বিজয় সরণি — তেজগাঁও শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা সেবা দেয়। বেশ কয়েকটি দূতাবাস ও ভিআইপি সড়ক করিডোরের কাছে।

১১. ফার্মগেট — অত্যন্ত ব্যস্ত স্টেশন। গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের সাথে সংযোগ। পিক আওয়ারে সবচেয়ে ভিড়ের স্টেশনগুলোর একটি।

১২. কারওয়ান বাজার — ঢাকার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার ও মিডিয়া হাবের পাশে। বাংলাদেশ টেলিভিশন সদর দপ্তর কাছেই।

১৩. শাহবাগ — বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় জাদুঘর এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শাহবাগ মোড়ের কাছে।

১৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাস সেবা দেয়। ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াত বেশি।

১৫. বাংলাদেশ সচিবালয় — সরকারি প্রশাসনিক কমপ্লেক্সের পাশে। সরকারি কর্মকর্তা ও দর্শনার্থীদের যাতায়াতের কেন্দ্র।

১৬. মতিঝিল — বর্তমান দক্ষিণ টার্মিনাল। ঢাকার আর্থিক হৃদয় — বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, কর্পোরেট অফিস। ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর চালু হয়েছে।

ভাড়া কাঠামো: কত টাকা লাগবে

মেট্রোরেলের ভাড়া দূরত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত। প্রতি কিলোমিটারে ৫ টাকা, সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ভাড়া ১০০ টাকা — উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পুরো পথের জন্য।

মানে হলো, কাছের এক বা দুটি স্টেশনের জন্য ২০ টাকা, আর পুরো ২০ কিলোমিটারের যাত্রায় ১০০ টাকা। মাঝামাঝি গন্তব্যের ভাড়া দূরত্ব অনুযায়ী এই দুটির মধ্যে পড়ে। ঢাকার অন্য পরিবহনের তুলনায় — সিএনজি, রাইড শেয়ার বা যানজটে আটকানো বাস — মেট্রো রেলের ভাড়া এবং সময় উভয়ই প্রতিযোগিতামূলক।

নিয়মিত যাত্রীদের জন্য এমআরটি পাস বা র‍্যাপিড পাস ব্যবহার করলে সব ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যায়। দুটি কার্ডের সুবিধা একই। প্রতিটি ১০ বছর মেয়াদী, যেকোনো স্টেশন কাউন্টারে রিচার্জ করা যায়। পাসধারীরা নিয়মিত টোকেন যাত্রীর তুলনায় কিছুটা বর্ধিত সময়সূচিতেও সেবা পান।

একক যাত্রার টোকেন ভেন্ডিং মেশিন বা কাউন্টার থেকে কেনা যায়। রাত ৮টা ৫০ মিনিটে সব টিকিট অফিস ও মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। রাতের শেষ ট্রেনে উঠতে চাইলে এর আগেই টোকেন কিনতে হবে।

সময়সূচি: সপ্তাহের দিন, শনি ও শুক্রবার

সাধারণ দিন ও শনিবার: উত্তরা উত্তর থেকে প্রথম ট্রেন ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে, শেষ ট্রেন রাত ৯টা ৩০ মিনিটে। মতিঝিল থেকে প্রথম ট্রেন সকাল ৭টায়, শেষ ট্রেন রাত ১০টা ১০ মিনিটে।

শুক্রবার: সাধারণ টোকেন যাত্রীদের জন্য সেবা শুরু হয় বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে। তবে এমআরটি পাস ও র‍্যাপিড পাসধারীরা সকাল ৭টা ১০ মিনিট থেকেই মেট্রো ব্যবহার করতে পারেন। শুক্রবার সকালে টোকেনে যাতায়াতের পরিকল্পনা থাকলে বিকল্প পরিবহন রাখতে হবে।

পিক আওয়ারে — সকাল ৮টা থেকে ১০টা এবং বিকেল ৫টা থেকে ৭টা — ট্রেন আসে ৬ থেকে ৮ মিনিট পরপর। অফ-পিকে ব্যবধান বেড়ে ১০ থেকে ১২ মিনিট হয়। লাইনে মোট ১২টি ট্রেন, যার মধ্যে ২টি রিজার্ভ।

রোহিঙ্গা সংকট ২০২৬: ১২ লাখ শরণার্থী, প্রত্যাবাসন নেই, সহায়তা কমছে

২০২৬ আপডেট: কমলাপুর এক্সটেনশনের অগ্রগতি

২০২৬ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট হলো কমলাপুর এক্সটেনশন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ডিএমটিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ১.১৬ কিলোমিটার বর্ধিতাংশের ৬৯ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সব ১৭৭টি পাইল, পাইল ক্যাপ, পিয়ার এবং স্টেশন কলাম শেষ হয়েছে। ২৭টির মধ্যে ২৫টি স্প্যান তোলা হয়েছে এবং কনকোর্স ছাদ, প্ল্যাটফর্ম স্ল্যাব ও স্টিল রুফ স্ট্রাকচার নির্মাণ সম্পন্ন। লক্ষ্যমাত্রা: ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি উদ্বোধন।

কমলাপুর চালু হলে এমআরটি লাইন ৬-এর মোট দৈর্ঘ্য হবে ২১.২৬ কিলোমিটার, স্টেশন সংখ্যা ১৭। কমলাপুরে থাকবে এমআরটি লাইন ১, লাইন ২ ও লাইন ৪-এর সাথে ইন্টারচেঞ্জ। মেট্রো থেকে সরাসরি বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান টার্মিনালে যাওয়া সম্ভব হবে।

আগামী পরিকল্পনা: ঢাকার মেট্রো নেটওয়ার্ক

আজকের দিনে এমআরটি লাইন ৬ই ঢাকার একমাত্র চালু মেট্রো লাইন। কিন্তু আরও তিনটি লাইন বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

এমআরটি লাইন ১ (এয়ারপোর্ট লাইন) নির্মাণাধীন। ১৯.৯ কিলোমিটারের এই রুটটি বাংলাদেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রো হবে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ১২টি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন। প্রত্যাশিত উদ্বোধন ২০২৬-২০২৭, তবে নির্মাণ সময়সীমা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।

এমআরটি লাইন ৫ (উত্তরাঞ্চল রুট) ২০২৩ সালের নভেম্বরে নির্মাণ শুরু হয়েছে। হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর হয়ে লাইন ৬-এর সাথে সংযোগ হবে। প্রত্যাশিত উদ্বোধন ২০২৮-এর দিকে।

এমআরটি লাইন ২ ও ৪ পরিকল্পনা পর্যায়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বেশিরভাগ লাইনই ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়বে।

যাত্রীদের জন্য কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ

পিক আওয়ারে ফার্মগেট, মিরপুর ১০ এবং মতিঝিল স্টেশনে ভিড় সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে রিপোর্ট হয়েছে যে ১০ থেকে ১২ মিনিটের বিরতিতে ট্রেন ভরে যাওয়ায় অনেক যাত্রী উঠতে পারেননি। ডিএমটিসিএল সমস্যাটি স্বীকার করেছে এবং সমাধানে কাজ চলছে।

বিমানবন্দর থেকে মেট্রোতে উঠতে হলে এখনও প্রথমে উত্তরা উত্তর স্টেশনে গাড়িতে বা সিএনজিতে আসতে হবে — মেট্রোর সাথে বিমানবন্দরের সরাসরি রেল সংযোগ লাইন ১ চালু হলে তবেই পাওয়া যাবে।

নিয়মিত যাত্রীদের জন্য এমআরটি পাস বা র‍্যাপিড পাস নেওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক। ১০ শতাংশ ছাড়, দ্রুত বোর্ডিং এবং বর্ধিত সময়সীমা — প্রতিদিনের যাত্রায় পার্থক্য তৈরি করে।

উত্তরার আবাসিক এলাকা থেকে মতিঝিলের ব্যাংক টাওয়ার পর্যন্ত — যে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই উত্তর-দক্ষিণ করিডোরে বাস করেন ও কাজ করেন — তাদের জন্য এমআরটি লাইন ৬ ঢাকায় চলাচলের হিসাব পাল্টে দিয়েছে। কমলাপুর এক্সটেনশন এবং পরের লাইনগুলো সেই পরিবর্তনকে আরও বিস্তৃত করবে।

win-tk.org একটি WinTK প্রকাশনা।