যে সংখ্যা সবাইকে চমকে দিয়েছে — বিশ্লেষকদেরও
২০২৪ সালের শেষে ডিএসইএক্স ছিল প্রায় ৩,৭০০ পয়েন্টে। বিনিয়োগকারীদের মনোভাব ছিল হতাশাগ্রস্ত। আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা নাড়িয়ে দিয়েছিল। দৈনিক লেনদেন ঐতিহাসিক নিম্নে — এফওয়াই২৫-এর প্রথম ছয় মাসে গড়ে মাত্র ৪৭২ কোটি টাকা, এফওয়াই২১-২২-এর ১,৫০০ কোটির বিপরীতে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ২০২৫ সালে ২৭০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে গেছেন। কোনো আইপিও বাজারে আসেনি।
এক বছর পরে চিত্র বদলেছে। ট্রেডিং ইকোনমিক্সের তথ্য অনুযায়ী ডিএসইএক্স বছর-ভিত্তিতে প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে — ২০২৫-এর শুরুতে ৩,৭০০ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ৫,৩০০ থেকে ৫,৫৫০-এর মধ্যে। ৫২-সপ্তাহের রেঞ্জ ৪,৫৮৮ থেকে ৫,৬৭৪। গড় দৈনিক লেনদেন এফওয়াই২৬-এর প্রথম ছয় মাসে ৬৫০ কোটিতে উঠেছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — নির্বাচনের আগের দিন — ডিএসইএক্স ৮২ পয়েন্ট বা ১.৫৮ শতাংশ বেড়ে ৫,৩১১-এ বন্ধ হয়, এক সেশনে বাজারে ৩,৩০০ কোটি টাকা যোগ হয়।
কী হলো? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — এটা কি সত্যিকারের পুনরুদ্ধার, নাকি অনুভূতি-চালিত আরেকটি র্যালি যা বাংলাদেশের বাজার বারবার তৈরি করেছে এবং মুছেও দিয়েছে?
বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ২০২৬: বাণিজ্য, সহায়তা ও নাগরিকদের কী বদলাবে
৪৬% বৃদ্ধির পেছনে তিনটি শক্তি
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ২০২৫-২৬-এর র্যালি একটি কারণে হয়নি। তিনটি শক্তির সম্মিলন ঘটেছে।
প্রথমত, নিয়ন্ত্রক সংস্কার। বিএসইসি মার্জিন রুলস ২০২৫, মিউচুয়াল ফান্ড রুলস এবং পাবলিক অফার রুলস সংশোধন করেছে। শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা হয়েছে ইসলামিক বিনিয়োগ পণ্য সম্প্রসারণে। এই সংস্কারগুলো তাৎক্ষণিকভাবে দাম বাড়ায়নি — কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের মূল্য নির্ধারণে এগুলো হিসাবে নিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নতি। মূল্যস্ফীতি এফওয়াই২৫-এর শুরুতে ১১ শতাংশের উপরে ছিল, ২০২৫-এর শেষে ৮-৯ শতাংশে নেমেছে। রেমিট্যান্স রেকর্ড ছুঁয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফ সমর্থনে স্থিতিশীল হচ্ছে। হংকংভিত্তিক এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ক্যাপিটাল বলেছে — "২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি কমলে সুদের হার কমবে, যা শেয়ারবাজারের মনোভাবের জন্য খুব ইতিবাচক।"
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক স্পষ্টতা। ১২ ফেব্রুয়ারির বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন এবং বিএনপির ২০৯ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা দূর করেছে। উভয় প্রধান রাজনৈতিক দল ইশতেহারে পুঁজিবাজার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এখন বাজার আসলে কেমন দেখাচ্ছে
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ডিএসইএক্স প্রায় ৫,৪০০-৫,৫৫০ পয়েন্টে — তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জরুরি। সেপ্টেম্বর ২০২১-এ সর্বকালের সর্বোচ্চ ৭,৩২৯ পয়েন্ট থেকে বাজার ৩০ শতাংশের বেশি পড়েছিল। বর্তমান স্তর সেই রেকর্ড নয় — এটি ২০২১-এর ফটকা বৃদ্ধির আগের স্তরে ফেরা, যা হয়তো স্বাস্থ্যকর।
২০২৫-এর শেষে পি/ই রেশিও ৮.৬-এ ঐতিহাসিক নিম্নে ছিল — পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে কম। এই মূল্যায়ন ব্যবধান বৈশ্বিক ফ্রন্টিয়ার মার্কেট বিনিয়োগকারীরা ব্যবহার করেছেন নির্বাচনের আগে অবস্থান নিতে।
র্যালি ব্রড-বেসড ছিল — ইতিবাচক লক্ষণ। ব্যাংকিং শেয়ার মোট লেনদেনের ২০.৬ শতাংশ, ওষুধ ১৫.৭ শতাংশ, বস্ত্র ১৫.৬ শতাংশ। ২৭ জানুয়ারি — ভারত-ইইউ চুক্তির দিন — লেনদেন ৭.৪৬ বিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে, চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা পরীক্ষা
বাজার নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফলে জটিল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি — নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম লেনদেন দিন — ডিএসইএক্স প্রায় ২০০ পয়েন্ট বেড়ে পাঁচ মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছায়। কিন্তু পরের চার সেশনে ক্রমাগত বিক্রির চাপে ২২ ফেব্রুয়ারি ৫,৪৬৮-এ নেমে আসে। বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট নীতি প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে গেছেন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম সরাসরি বলেছেন — "আমরা দেখতে চাই নতুন সরকার ১০০ দিনের মধ্যে ইশতেহার অনুযায়ী কী কংক্রিট পদক্ষেপ নেয়।" অর্থমন্ত্রী খসরু স্বীকার করেছেন সাময়িক মনোভাব-চালিত লাভ মৌলিক পরিবর্তন আনবে না।
ইইউ-ভারত বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলার পোশাক রফতানি হুমকিতে
যে কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকেই গেছে
৪৬ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধি বাস্তব। তবে কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান হয়নি।
বাজার অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত — কয়েকটি ব্লু-চিপ কোম্পানি সূচকের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে। আইপিও পাইপলাইন পাতলা — নতুন মানসম্পন্ন কোম্পানি না এলে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বাড়ানো সীমিত। বিদেশি অংশগ্রহণ সংকুচিত। এবং সবচেয়ে গভীর সমস্যা: বাজার মৌলিক ভিত্তির চেয়ে অনুভূতি-নির্ভর — ২০১০-এর ধস, ২০২১-এর বুদবুদ, ২০২২-২৪-এর পতন একই প্যাটার্নে।
নতুন সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা — এবং বিনিয়োগকারীরা কী দেখবেন
নতুন বিএসইসি চেয়ারম্যান কে হবেন — বাজার অংশীজনরা স্পষ্ট বলেছেন মেধাভিত্তিক, বেসরকারি খাতের নেতৃত্ব চান। বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারি শেয়ার অফলোড করা হবে কিনা। মূল্যস্ফীতি কমলে সুদের হার কমবে কিনা — এটাই ইকুইটির সবচেয়ে শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক চালক। পণ্য বিনিময় এবং ব্লকচেইন-ভিত্তিক ব্যাক-অফিস সিস্টেম কতটা দ্রুত বাস্তবায়ন হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে — "পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কাঠামোগত সংস্কার এবং টেকসই নিয়ন্ত্রক উন্নতির উপর।" এটি আশাবাদী পূর্বাভাস নয় — এটি শর্তসাপেক্ষ।
৪৬ শতাংশ বার্ষিক লাভ প্রমাণ করেছে — যখন শর্তগুলো একসাথে মেলে, বাংলাদেশের বাজার বিশ্বের যেকোনো ফ্রন্টিয়ার মার্কেটের সমকক্ষ রিটার্ন দিতে পারে। আগামী বারো মাসের প্রশ্ন — এই শর্তগুলো কি টেকসই হবে, নাকি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ আবার তার পুরনো প্যাটার্নে ফিরবে: র্যালি, উত্তেজনা, হতাশা, পতন।
বাংলাদেশের ৮ কোটি ২০ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য — যারা এখন মোবাইল অ্যাপে ডিএসইএক্স অনুসরণ করছেন — এই প্রশ্ন আর বিমূর্ত নয়।
win-tk.org একটি WinTK প্রকাশনা। বাংলাদেশের বাজার, অর্থনীতি ও রাজনীতির স্বাধীন সংবাদের জন্য ভিজিট করুন win-tk.org। যোগাযোগ: editor@win-tk.org