একদিনে সব বদলে গেল

২৭ জানুয়ারি ২০২৬। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তির। ভন ডার লায়েন নিজেই বললেন — এটি "সব চুক্তির মা।" ইইউ-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের ৯৬.৬ শতাংশ রফতানিতে শুল্ক শূন্যে নামাবে। পোশাক ও বস্ত্রে বর্তমান ৯-১২ শতাংশ শুল্ক ২০২৭ সাল থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবে।

ঢাকায় প্রতিক্রিয়া উদযাপনের ছিল না। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউরোপীয় দেশগুলোতে ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে — মোট পোশাক রফতানির ৫০.১০ শতাংশ। সেই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এখন অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার পথে। ধীরে। কিন্তু অনিবার্যভাবে।

অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক সরাসরি বলেছেন — ভারত-ইইউ চুক্তি ২০২০ সালের ভিয়েতনাম-ইইউ চুক্তির চেয়ে বড় হুমকি। কারণ ভারতের সাপ্লাই চেইনের গভীরতা ইউরোপীয় ক্রেতাদের আরও স্থায়ীভাবে সরে যেতে প্রলুব্ধ করতে পারে।

বাংলাদেশ জিডিপি ২০২৬: আইএমএফের ৪.৭% পূর্বাভাস — কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ

কীভাবে বাংলাদেশ ১৯ বিলিয়ন ডলারের সুবিধা তৈরি করল — এবং কেন তা এখন ক্ষয় হচ্ছে

১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ইইউর "এভরিথিং বাট আর্মস" সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে ইউরোপে রফতানি করছে। ভারতীয় পোশাকে ৯-১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে বলে ইউরোপীয় ক্রেতারা বাংলাদেশমুখী হয়েছেন। ফলাফল অভূতপূর্ব।

২০১০ সালে ইইউর পোশাক আমদানিতে চীনের অংশ ছিল ৪৫ শতাংশ — ২০২৫ সালে সেটা ২৮ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে বাংলাদেশের অংশ ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশ হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার ও টি-শার্টে বাংলাদেশ চীনকেও পেছনে ফেলেছে। ইইউ এখন বাংলাদেশের মোট রফতানির ৪৪ শতাংশ গ্রহণ করে।

এই সুবিধা সবসময়ই সাময়িক ছিল। নভেম্বর ২০২৬-এ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর তিন বছরের ট্রানজিশন পিরিয়ড — অর্থাৎ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে। পরিকল্পনা ছিল এই সময়ে জিএসপি+ বা দ্বিপক্ষীয় এফটিএ নিশ্চিত করা। ভারত-ইইউ চুক্তি সেই পরিকল্পনাকে আরও জরুরি এবং আরও কঠিন করে তুলেছে।

যে সংখ্যাগুলো ঢাকার প্রতিটি কারখানা মালিককে উদ্বিগ্ন করা উচিত

র‍্যাপিডের মডেলিং দুটি পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।

প্রথম পরিস্থিতি — বাংলাদেশ এলডিসি সুবিধা ধরে রাখলে এবং ভারত-ইইউ চুক্তি কার্যকর হলে — পোশাক রফতানি ১৯ কোটি ডলার কমবে। বেদনাদায়ক, কিন্তু সামলানো সম্ভব।

দ্বিতীয় পরিস্থিতি — বাংলাদেশ এলডিসি পরবর্তী এমএফএন শুল্কের মুখে পড়লে এবং ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে — পোশাক রফতানি ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমবে। জিটিএপি মডেলের সিমুলেশন বলছে রফতানি ৩৬.৫ শতাংশ পড়তে পারে। বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলী শামীম এহসান বলেছেন — জিএসপি+ না পেলে ইইউতে রফতানি ৫০ শতাংশ কমতে পারে।

জুলাই সনদ গণভোট: বাংলাদেশ কীভাবে রাষ্ট্র সংস্কারে ভোট দিল

কেন ভারত ভিয়েতনামের চেয়ে আলাদা প্রতিযোগী

২০২০ সালে ভিয়েতনাম-ইইউ এফটিএর সময় বাংলাদেশ ধাক্কা সামলে নিয়েছিল। ভিয়েতনামকে ডাবল ট্রান্সফর্মেশন নিয়ম মানতে হয়েছিল — অর্থাৎ কাপড় বোনা ও সেলাই একই দেশে হতে হবে। ভিয়েতনাম এই নিয়ম পূরণ করতে সংগ্রাম করেছে।

ভারত কাঠামোগতভাবে ভিন্ন। ভারত নিজেই তুলা উৎপাদন করে, সুতা কাটে, কাপড় বোনে এবং পোশাক তৈরি করে। বাংলাদেশ বেশিরভাগ কাপড় চীন থেকে আমদানি করে। এই আমদানি নির্ভরতা দুটি সমস্যা তৈরি করে — ডাবল ট্রান্সফর্মেশন নিয়ম পূরণ কঠিন হয়, এবং উৎপাদন খরচে আমদানি উপাদান যুক্ত থাকে যা ভারতীয় প্রতিযোগীদের নেই।

ভারতের ২০২৬-২৭ ইউনিয়ন বাজেটে ৪০,০০০ কোটি রুপির টেক্সটাইল মিশন ঘোষণা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী পিযুষ গোয়েল বলেছেন এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে ভারতের বস্ত্র রফতানি ৭ বিলিয়ন থেকে ৩০-৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই বৃদ্ধির বড় অংশ আসবে বাংলাদেশের বাজার থেকে।

একসাথে দুই ধাক্কা — ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র

ইইউ-ভারত চুক্তি একা আসেনি। কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তিতে আমেরিকান শুল্ক ভারতীয় পণ্যে ১৮ শতাংশে নামল — বাংলাদেশের চেয়ে দুই শতাংশ কম। বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ১৯.১৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়।

বাংলাদেশ এখন একসাথে দুটি বৃহত্তম রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধায় পড়েছে। ইইউর বাজারও আরও কঠিন হয়েছে — টেকসই সাপ্লাই চেইন যাচাই এবং কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম ছোট বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা।

বাংলাদেশের কাছে এখনও যা আছে — এবং তা দিয়ে কী করতে হবে

পরিস্থিতি গুরুতর, তবে অসম্ভব নয়। বাংলাদেশের কাছে বাস্তব শক্তি আছে।

বিশ্বে সর্বাধিক এলইইডি-সার্টিফাইড সবুজ পোশাক কারখানা বাংলাদেশে — ইউরোপের সাসটেইনেবিলিটি চাহিদায় এটি মূল্যবান সম্পদ। দশকের পর দশকের ক্রেতা সম্পর্ক রাতারাতি বদলায় না। শ্রম খরচ প্রতিযোগিতামূলক।

কৌশলগত বিকল্প স্পষ্ট। জিএসপি+ আবেদন জরুরিভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে — এর জন্য শ্রম অধিকার, মানবাধিকার ও পরিবেশ বিষয়ক ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন পালনের প্রমাণ দিতে হবে। জুলাই সনদের সুশাসন সংস্কার সেই আবেদনকে শক্তিশালী করবে। জিএসপি+ ব্যর্থ হলে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ আলোচনা শুরু করতে হবে।

শিল্পকে ম্যান-মেড ফাইবার পণ্যে যেতে হবে — পলিয়েস্টার, নাইলন, ভিসকোজ — যেগুলোতে ইউরোপের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কাপড় উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উচ্চমূল্যের পণ্যে যেতে হবে যেখানে শুধু দামের প্রতিযোগিতা নয়, ডিজাইন ও প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘড়ির কাঁটা চলছে

ইইউ-ভারত চুক্তির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে এক থেকে দুই বছর লাগবে — কার্যকর হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭-২৮। বাংলাদেশের ট্রানজিশন পিরিয়ড নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত। হয়তো তিন বছর সময় আছে। বাণিজ্য নীতিতে তিন বছর কম।

পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠই নারী। ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলারের ইইউ রফতানি বৈদেশিক মুদ্রা, পারিবারিক আয় এবং কোটি নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ধরে রাখে। আগামী পাঁচ বছরে সেই রফতানির কী হবে — এটি বিমূর্ত বাণিজ্য নীতির প্রশ্ন নয়। এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের প্রশ্ন।

বাংলাদেশ পছন্দের সুবিধা এবং শিল্পের শৃঙ্খলায় রফতানি অলৌকিক ঘটনা তৈরি করেছে। ভারত-ইইউ চুক্তি সেই সুবিধার যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করল। শুধু শিল্পের শৃঙ্খলা দিয়ে প্রতিযোগিতা সম্ভব কিনা — এটাই আগামী দশকের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন।

win-tk.org একটি WinTK প্রকাশনা। বাংলাদেশের বাণিজ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতির স্বাধীন সংবাদের জন্য ভিজিট করুন win-tk.org। যোগাযোগ: editor@win-tk.org