তিনজনে দুইজনেরও বেশি: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জরিপ যা বলছে
২০২৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪-এর পূর্ণ ফলাফল প্রকাশ করলে সংখ্যাগুলো এতটাই স্পষ্ট ছিল যে সমস্যার মাত্রা নিয়ে আর কোনো বিতর্কের জায়গা রইল না। প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজন — ৭৬ শতাংশ — জীবনে কোনো না কোনো সময়ে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। শুধু গত বারো মাসে ৪৯ শতাংশ নারী এই সহিংসতার কথা জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ান সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এই জরিপে ২৭,৪৭৬ জন অংশগ্রহণ করেছেন — এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং বিশ্বে এই ধরনের সবচেয়ে বড় জরিপ।
সংখ্যাগুলো এক দশকের পরিবর্তনও ধরে রেখেছে। ২০১৫ সালের জরিপে গত বছরে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার হার ছিল ৬৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে এটি কমে ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে — ১৭ শতাংশ পয়েন্টের এই হ্রাস বাস্তব অগ্রগতি হলেও অসম্পূর্ণ। কারণ ৪৯ শতাংশ মানেও কোটি কোটি নারী। আর কিছু উপদলে জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক ভয়াবহ চিত্র — ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীরা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে, তাদের ৬২ শতাংশেরও বেশি গত বছর সহিংসতার শিকার হয়েছে। উপকূলীয় দুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারীদের আজীবন অভিজ্ঞতার হার ৮১ শতাংশ।
পরিসংখ্যানের আড়ালে আছে নীরবতার সংস্কৃতি। জরিপ অনুযায়ী, স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার ৬৪ শতাংশ নারী কাউকেই কিছু বলেননি। পরিবারের কাউকে না, প্রতিবেশীকে না, পুলিশকে না। সরকারের জরুরি হেল্পলাইন সম্পর্কে সচেতনতাও কম — মাত্র ৪৫ শতাংশ নারী ৯৯৯ নম্বরের কথা জানেন, আর ১০৯ নম্বর গার্হস্থ্য সহিংসতা হেল্পলাইন সম্পর্কে জানেন মাত্র ১২ শতাংশ।
বিচারের ফাঁক: মামলা করলে কী হয়
বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় মামলা দায়ের করা ভুক্তভোগীর দুর্ভোগের শেষ নয় — প্রায়ই এটি ভিন্ন ধরনের কষ্টের শুরু। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য দেখায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার মামলা তীব্রভাবে বাড়ছে। ২০২৪ সালের শেষ চার মাসে ৫,৭৯৫টি মামলা রেকর্ড হয়। ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসেই সেটা বেড়ে ৭,০২৮-এ পৌঁছায়। ২০২৩ সালের শুরুতে মাসে গড়ে ১,৫০০ মামলার তুলনায় ২০২৫ মাঝামাঝিতে তা প্রায় ২,০০০-এ উঠেছে।
কিন্তু মামলা রেকর্ড আর বিচার পাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (BLAST) নির্বাহী পরিচালক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসাইন বলেছেন স্পষ্ট করে: "মিডিয়ায় প্রতি মাসে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ হয়রানির ঘটনা আসে। কিন্তু কতজনের সাজা হয়েছে বা ভুক্তভোগী কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন তার কোনো ব্যাপক তথ্য নেই।" নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম বলেই বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেন — সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, দীর্ঘ বিলম্ব, মামলার জট সব মিলিয়ে।
মানবাধিকার সহায়তা সোসাইটির তথ্য আরও বিষণ্ণ চিত্র তুলে ধরে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংস্থাটি অন্তত ১১,৭৫৮ নারী ও মেয়েকে সহিংসতার শিকার হিসেবে নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে ৬,৩০৫টি ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের শিকারদের ৩,৪৭১ জন — ৫৫ শতাংশেরও বেশি — ছিলেন ১৮ বছরের নিচে। ১,০৮৯ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে ২০৭ জনকে, যার মধ্যে ১১৮ জন শিশু।
সংস্কার কমিশন এবং ৪৩৩টি সুপারিশ
আগস্ট ২০২৪-এ ক্ষমতায় আসার পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে অস্বাভাবিক গতিতে এগিয়েছে। নভেম্বর ২০২৪-এর মধ্যে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠিত হয়, নেতৃত্বে নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হক। ১০ সদস্যের এই কমিশন ৪৩টি অভ্যন্তরীণ সভা ও ৩৯টি পরামর্শ অধিবেশন শেষে ১৯ এপ্রিল ২০২৫ প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ১৫টি বিষয়ের অধীনে ৪৩৩টি সুপারিশ রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিস্ফোরক প্রস্তাবগুলো বৈষম্যের কাঠামোগত ভিত্তিকে সরাসরি আঘাত করেছে। কমিশন সুপারিশ করেছে একটি অভিন্ন পারিবারিক কোড — বিবাহ, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারে ধর্মভিত্তিক পৃথক আইনের পরিবর্তে একটি সমন্বিত আইন। বর্তমানে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে মেয়েরা ছেলেদের অর্ধেক সম্পত্তি পায়, হিন্দু আইনে অধিকার আরও সীমিত। কমিশন বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে — যা বর্তমানে বাংলাদেশের আইনে স্বীকৃত নয়। ৬০০ আসনের প্রস্তাবিত সংসদে ৩০০ আসন সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার কথাও বলেছে।
প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক ছিল। ৪ মে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের হয় বেশ কিছু সুপারিশকে ইসলামী শরিয়া ও সংবিধানের পরিপন্থী বলে চ্যালেঞ্জ করে। ঢাকার রাস্তায় হেফাজতে ইসলামের প্রায় ২০,০০০ সমর্থক মিছিল করেন এই সংস্কারের বিরোধিতায়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশ্যে ইউনূস সরকারকে নারীর মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে এই আক্রমণের নিন্দা করে সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশে যে যৌন হয়রানি আইন নেই
২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জনপরিসর, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে একটি স্বতন্ত্র আইনের জন্য লড়াই করে আসছে। ষোলো বছর পরেও সেই আইন নেই। দেশ চলছে ২০০৯ সালের হাইকোর্ট নির্দেশিকায় — যা আইনি বাধ্যবাধকতার শক্তি ছাড়া শুধু নির্দেশনা, নিয়োগকর্তারা প্রায়ই যা মানেন না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাক্টিভিস্ট মাসুদা রোজি বলেছেন: "আমাদের সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে যৌন হয়রানিকে প্রায়ই অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। আনুষ্ঠানিক আইন ছাড়া অপরাধীদের জবাবদিহি করানো কঠিন।"
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ হিসেবে এসেছে। এছাড়া প্রতিবেদনটি প্রযুক্তি-সহায়তা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে দ্রুত বর্ধমান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে — জরিপে ৮.৩ শতাংশ নারী এই ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন, যা ২০১৫ সালের জরিপে প্রায় পরিমাপযোগ্যই ছিল না। বাংলাদেশে ৫ কোটির বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী এবং মোবাইল ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের সাথে এই বিভাগটি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশ কোথায়
বাংলাদেশের সংখ্যা বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হবে না। দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার হার বিশ্বে সর্বোচ্চের মধ্যে — পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক নিয়ম, নারীর কম অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বাল্যবিবাহ, এবং গৃহক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে ঐতিহাসিকভাবে অনুপযুক্ত মনে করার বিচার ব্যবস্থার সমন্বয়ে। ভারতের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ দেখায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিবাহিত নারী স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার। পাকিস্তানে ব্যাপক অপ্রতিবেদনের সাথে আইনি কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে বিচারকে কঠিন করে রেখেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান মুহূর্তকে আলাদা করে উচ্চমানের নতুন তথ্য, বিস্তারিত ও কার্যকর সুপারিশসহ একটি সক্রিয় সংস্কার কমিশন, এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সমন্বয় — যার নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা নেই এবং যা ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে যেতে পারে না। বাধাগুলো বাস্তব এবং গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু তথ্য আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনজনে দুইজনেরও বেশি। গত বছরে ৪৯ শতাংশ। কিশোরীদের ৬২ শতাংশ। এগুলো অনুমান নয় — এগুলো এই দেশে পরিচালিত সবচেয়ে বড় জরিপের ফলাফল।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা যা বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশিয়ার পাঠকদের জন্য বৈশ্বিক বিষয় ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করে।