মিনার-ই-পাকিস্তানের সেই রাত — এবং যা উন্মোচিত হলো

২০২১ সালের ১৪ আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের রাতে, লাহোরের মিনার-ই-পাকিস্তানে শত শত পুরুষের একটি জনতা একজন নারী টিকটক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলা চালায়। হামলা ক্যামেরায় ধারণ হয়, ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে এটি আন্তর্জাতিক সংবাদ হয়ে ওঠে — কারণ এটি ব্যতিক্রম ছিল না, বরং নথিভুক্ত ছিল। ক্যামেরা যা ধারণ করেছিল তা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় — এটি পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে চলা কাঠামোগত সংকটের দৃশ্যমান অংশ: নারীকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে ব্যাপক ব্যর্থতা এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিতে বিচার ব্যবস্থার ধারাবাহিক অক্ষমতা।

তিন বছরের বেশি সময় পরে তথ্য নিশ্চিত করছে যে মিনার-ই-পাকিস্তানের সেই ঘটনা একটি আঞ্চলিক ধারার প্রতিফলন। ২০২৪ সালে পাকিস্তানে শুধু নথিভুক্ত নারী নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩২,৬১৭টি। বাংলাদেশে ৭৬ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় অন্তরঙ্গ সঙ্গীর কাছ থেকে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়া আজও বিশ্বের নারীর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি।

পাকিস্তানের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সংকট: ২০২৪-এর তথ্য

সাসটেইনেবল সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (SSDO) ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত "Mapping GBV in Pakistan 2024" রিপোর্ট সাম্প্রতিক সবচেয়ে বিস্তারিত চিত্র দেয়। ৩২,৬১৭টি নথিভুক্ত মামলার মধ্যে ছিল ২৪,৪৩৯টি অপহরণ, ৫,৩৩৯টি ধর্ষণ, ২,২৩৮টি গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং ৫৪৭টি সম্মান-রক্ষার নামে হত্যা। পাঞ্জাবে সবচেয়ে বেশি ২৬,৭৫৩টি মামলা। তবে রিপোর্টে উল্লেখ আছে, মাত্র ১০ শতাংশের কম ভুক্তভোগী বিচার চান — অর্থাৎ প্রকৃত সংখ্যা নথিভুক্তের দশগুণ বা তার বেশি হতে পারে।

সবচেয়ে বিধ্বংসী সংখ্যাগুলো হলো দোষসাব্যস্তের হার। ধর্ষণে জাতীয় দোষসাব্যস্তের হার মাত্র ০.৫ শতাংশ। সম্মান হত্যায়: ০.৫ শতাংশ। অপহরণে: ০.১ শতাংশ। গার্হস্থ্য সহিংসতায়: ১.৩ শতাংশ। হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান ২০২৪ সালে শুধু পাঞ্জাবেই ৬০,০০০-এর বেশি মামলা নথিভুক্ত করেছিল, কিন্তু মাত্র ৯২৪ জন সাজা পেয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৭,৫০০-এর বেশি নারী নিহত হয়েছেন — যার মধ্যে ১,৫৫৩টি সম্মান হত্যা।

কাগজে পাকিস্তানের আইনি কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী — ২০০৬ সালের নারী সুরক্ষা বিল, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের গার্হস্থ্য সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, ২০১৬-এর পাঞ্জাব সুরক্ষা আইন। সমস্যা আইনের অভাবে নয় — সমস্যা প্রয়োগের কাঠামোগত ব্যর্থতায়। পুলিশের হস্তক্ষেপে অনীহা, দীর্ঘসূত্রিত বিচার প্রক্রিয়া, ক্ষমতাবান উপজাতীয় ও রাজনৈতিক সংযোগ, এবং কলঙ্কের ভয়ে চুপ থাকার সংস্কৃতি — এই সব মিলিয়ে অপরাধীদের কার্যত দায়মুক্তি নিশ্চিত হয়ে যায়।

মিনার-ই-পাকিস্তানের ঘটনা: গণপরিসরে সহিংসতার প্রতীক

২০২১ সালের লাহোরের হামলাটি এত প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এর পরিবেশ: মিনার-ই-পাকিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে ১৯৪০ সালের লাহোর রেজোলিউশন গৃহীত হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটল জাতীয় দিবসে, বিশাল জনসমাগমে, দিনের আলোয়। ভুক্তভোগী এসেছিলেন উৎসবে যোগ দিতে।

দুটি নির্দিষ্ট গতিশীলতা এখানে স্পষ্ট। প্রথমত, জনতার দায়মুক্তি: শত শত অংশগ্রহণকারী থাকলেও প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখাল যে জনপরিসরে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন: ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে কিছু সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, কিন্তু ভাইরাল ভিডিও কেবল গ্রেফতার নিশ্চিত করতে পারে — বিচার ব্যবস্থার গঠামূলক পরিবর্তন আনতে পারে না। পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সিতে হয়রানির ৯০ শতাংশ অভিযোগ নারীদের। ৭০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী অনলাইন হয়রানির শিকার। সহিংসতা এখন শারীরিক থেকে ডিজিটাল পরিসরেও ছড়িয়েছে।

বাংলাদেশ: ভিন্ন প্রেক্ষাপট, একই কাঠামোগত সমস্যা

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে জটিল — ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী দশকগুলোর কূটনৈতিক টানাপোড়েন। তবু লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ক্ষেত্রে দুটি দেশে কাঠামোগত মিল অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও UNFPA-র ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপ — বৈশ্বিকভাবে এ ধরনের সবচেয়ে বড় জরিপ, ২৭,৪৭৬ জন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করে — একটি গুরুতর চিত্র দেয়। তিনজনের মধ্যে তিনজনই (৭৬ শতাংশ) জীবদ্দশায় অন্তরঙ্গ সঙ্গীর কাছ থেকে অন্তত একটি রূপের সহিংসতার শিকার। গত ১২ মাসে ৪৯ শতাংশ নারী এই সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। ৫৪ শতাংশের বেশি নারী স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক বা যৌন সহিংসতা অনুভব করেছেন। গর্ভাবস্থায় ৭.২ শতাংশ বিবাহিত নারী শারীরিক সহিংসতার শিকার।

ইতিবাচক দিক হলো, সাম্প্রতিক অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার হার ২০১৫ সালের ৬৬ শতাংশ থেকে ২০২৪-এ ৪৯ শতাংশে নেমেছে — এক দশকে ১৭ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্সে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জানুয়ারি ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে — আংশিকভাবে নারীর অধিকার সংকুচিত করতে সচেষ্ট কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কারণে।

নীরবতার সংস্কৃতি পাকিস্তানের সমান। বাংলাদেশে স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া ৬৪ শতাংশ নারী কাউকেই জানাননি। মাত্র ১২ শতাংশ হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে জানেন। ৪৮.৫ শতাংশ নারী জানেন কোথায় অভিযোগ করতে হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ধারা: ভাগ করা কাঠামোগত ব্যর্থতা

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আঞ্চলিক একটি নিদর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে যার বৈশিষ্ট্যগুলো সর্বত্র একই: অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার উচ্চ হার, কলঙ্কের ভয়ে ব্যাপক কম-রিপোর্টিং, অপরাধীদের জবাবদিহির ক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সহিংসতা বৃদ্ধির প্রবণতা।

ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা — একই ধারা দেখা যায়: যথেষ্ট আইনি কাঠামো, অপর্যাপ্ত প্রয়োগ, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রিপোর্ট না করেই চলে যাওয়া। আফগানিস্তানে ২০২১ সাল থেকে তালেবান শাসনে নারীর অধিকার পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

UNFPA আঞ্চলিক সক্রিয় কারণগুলো চিহ্নিত করেছে: প্রজন্মধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক নিয়মাবলি, গার্হস্থ্য সহিংসতাকে পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখার পুলিশ সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা যা নারীকে নির্যাতনমূলক সম্পর্কে আটকে রাখে, এবং বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সীমিত সুযোগ।

সংস্কারের পথ: আইন, প্রয়োগ এবং সংস্কৃতি

দক্ষিণ এশিয়ার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সংকটের সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য হলো আইনগত অগ্রগতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ — উভয় দেশেই আইন আছে। সমস্যা আইনের অভাব নয়, প্রয়োগকারী ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।

বাংলাদেশে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন নারীর সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, ভুক্তভোগীদের জন্য বিচারের সুযোগ শক্তিশালী করা এবং CEDAW-র আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও জাতিসংঘের নারী সংস্থা উভয়ই জোর দিয়ে বলেছে, এই প্রস্তাবগুলো নতুন নয় — বহু বছর ধরে বাংলাদেশিরা এগুলো সমর্থন করে আসছেন। প্রশ্ন হলো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা ও সম্পদ বরাদ্দের।

মিনার-ই-পাকিস্তানের হামলা বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল। কিছু গ্রেফতার হয়েছিল। অপরাধীরা অদৃশ্য ছিলেন না। তবু প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া — গ্রেফতারে নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনে পরিমাপ করলে — ছিল ক্ষুদ্র। দৃশ্যমানতা এবং জবাবদিহিতার মধ্যে এই ব্যবধান, ডকুমেন্টেশন এবং বিচারের মধ্যে এই ফাঁক — এটাই দক্ষিণ এশিয়ার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সংকটের মূল চ্যালেঞ্জ।

win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধ সরকারি জরিপ তথ্য ও তদন্তমূলক প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে তৈরি। বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিরা হেল্পলাইন ১০৯ বা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করতে পারেন।