মাদক ত্রিভুজের মাঝে আটকে থাকা একটি দেশ
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিমানবন্দর সশস্ত্র পুলিশের যৌথ অভিযানে ৮.৩ কিলোগ্রাম কোকেইন জব্দ হয় — বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সর্ববৃহৎ কোকেইন আটকের ঘটনা। গ্রেপ্তার হয় ছয়জন বিদেশি নাগরিক: একজন মালাউয়ান, চারজন নাইজেরিয়ান ও একজন তানজানিয়ান। তদন্তে বেরিয়ে আসে, মাদকের গন্তব্য বাংলাদেশ ছিল না — পূর্ব আফ্রিকা থেকে ঢাকার আকাশপথ ব্যবহার করে এটি ভারতে পাচার হওয়ার কথা ছিল। কোনো মাদক উৎপাদন না করা একটি দেশ আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে — এই বাস্তবতাটি সেই অভিযানেই স্পষ্ট হয়ে যায়।
এই ঘটনা বহু বছর ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মাদক বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তাকে দৃশ্যমান করে তোলে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ছিদ্রযুক্ত সীমান্ত এবং প্রয়োগ-ঘাটতি একে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাদক করিডোরে পরিণত করেছে। এখন এটি শুধু মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার বিরুদ্ধে লড়াই নয় — বরং এমন বৈশ্বিক পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যারা বাংলাদেশকে পথ হিসেবে এবং ক্রমশ বাজার হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্বের দুটি বৃহত্তম মাদক অঞ্চলের মাঝখানে
বাংলাদেশের মাদক পাচারের ঝুঁকি অনেকটাই তার ভৌগোলিক অবস্থানের ফল। পূর্বে রয়েছে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল — মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনাম — যেখান থেকে মেথামফেটামিন, হেরোইন ও সিন্থেটিক উদ্দীপক সরবরাহ হয়। পশ্চিমে গোল্ডেন ক্রিসেন্টের প্রভাব — আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ইরান করিডোর, যা বিশ্বের বেশিরভাগ আফিম ও হেরোইন উৎপাদন করে। বাংলাদেশের মিয়ানমারের সাথে ২৭১ কিলোমিটার এবং ভারতের সাথে চার হাজারেরও বেশি কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যার বেশিরভাগ অংশ পর্যাপ্ত নজরদারির বাইরে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, প্রধান প্রবেশপথগুলো নির্দিষ্ট। ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ আসে টেকনাফ ও নাফ নদী হয়ে মিয়ানমার থেকে। হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিল আসে ভারতীয় সীমান্ত পেরিয়ে রাজশাহী, যশোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চুয়াডাঙ্গা দিয়ে। কোকেইন ও এলএসডি আসে বিমানপথে — আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকান নেটওয়ার্ক ঢাকার বিমানবন্দরকে রিলে পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে। নাইজেরিয়ান ও ঘানাইয়ান সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশে সক্রিয় থেকে অভিযান পরিচালনা করছে বলেও ডিএনসি নথিভুক্ত করেছে।
পরিসংখ্যান যা বলে — এবং যা বলে না
বার্ষিক মাদক প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২ কোটি ২৮ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ হয়েছে — যা ২০২৩ সালের ৪ কোটি ২৯ লাখের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক এই পতনের আংশিক কারণ হিসেবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে সরবরাহ-শৃঙ্খল বিঘ্নকে চিহ্নিত করেছেন। তবে হেরোইন জব্দের চিত্র ভিন্ন: ২০২৪ সালে ৫০৩ কিলোগ্রাম, ২০২৩ সালে ৭০০ কিলোগ্রাম — যেখানে ২০২২ সালে ছিল মাত্র ৩৩৮ কিলোগ্রাম। কোকেইন জব্দ বেড়েছে দশগুণ: ২০২৩ সালের ১৩ কিলোগ্রাম থেকে ২০২৪ সালে ১৩০ কিলোগ্রামে।
তবে এই সংখ্যাগুলো প্রকৃত প্রবাহের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক অফিস (UNODC) বৈশ্বিক অনুমান দেয় যে পাচার হওয়া মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ আটক হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশের প্রকৃত মাদক বাণিজ্যের আকার সরকারি পরিসংখ্যানের কয়েকগুণ বড়। ২০২৩ সালের একটি আঙ্কটাড প্রতিবেদন বাংলাদেশকে মাদক-সংক্রান্ত অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রেখেছে — ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বার্ষিক গড়ে ৪৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে মাদক পাচারের মাধ্যমে।
৮৩ লাখ ব্যবহারকারী এবং একটি চাপে পড়া ব্যবস্থা
ডিএনসির সর্বশেষ জরিপে বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮৩ লাখ — ২০১৮ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ৩৬ লাখের অনুমানের দ্বিগুণেরও বেশি। গাঁজা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক, তারপর ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও ক্রিস্টাল মেথ। ডিএনসি জানায়, মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু বস্তি বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নেই — মধ্যবিত্ত পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমপক্ষে ৩২ জেলার পেশাদার পরিবেশেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে।
দ্রুত নগরায়ন পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত রাস্তা-পর্যায়ের বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক গতিশীলতার সংকট তরুণদের মাদক ব্যবহার ও পাচার নেটওয়ার্কে নিয়োগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮: উচ্চাভিলাষ ও তার সীমা
বাংলাদেশের প্রধান আইনি কাঠামো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮, যা ১৯৯০ সালের আইন প্রতিস্থাপন করে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করেছে — কিছু পাচার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত। আইনটি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের বিধান একত্রিত করেছে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের ব্যবস্থাও রেখেছে।
কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ হতাশাজনক। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি তদন্তী প্রতিবেদন ২৬ জেলায় ৫০০টি মাদক মামলার রায় বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ৫৯ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। মাত্র ২০৪টি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছে — অর্থাৎ দোষী সাব্যস্তের হার মাত্র ৪১ শতাংশ। প্রতিবেদনে পাওয়া ব্যর্থতার কারণগুলো পদ্ধতিগত: ত্রুটিপূর্ণ এজাহার, দুর্বল তদন্ত, নিরপেক্ষ সাক্ষীর অনুপস্থিতি, প্রমাণ হস্তান্তরে অনিয়ম এবং আদালতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য।
সীমানাহীন সিন্ডিকেট: আন্তর্জাতিক মাত্রা
বাংলাদেশের মাদক পাচারে এমন বহুজাতিক অপরাধী সংগঠনের যুক্ততা ক্রমশ বাড়ছে যাদের অভিযান পরিচালনের সক্ষমতা দেশীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি। ডিএনসি ও পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, স্থানীয় একাধিক পাচার সিন্ডিকেটের মূলহোতারা নাইজেরিয়া, ঘানা, ভারত ও মিয়ানমারের নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখে।
২০২৫ সালের আগস্টে UNODC-এর যাত্রী ও কার্গো নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ কাস্টমস ও ডিএনসির ১৮ জন কর্মকর্তার জন্য চার দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যাত্রী প্রোফাইলিং ও কার্গো বিশ্লেষণের মতো পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা হয়। বাংলাদেশ ভারত ও মিয়ানমারের সাথে মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং নিয়মিত পরিচালক পর্যায়ের বৈঠক করছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, মিয়ানমার সীমান্তের কাছের ইয়াবা কারখানা ধ্বংসের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধে মিয়ানমার এখনো যথেষ্ট সাড়া দেয়নি।
সংস্কারের পথ: কোথায় বদলাতে হবে
৫৯ শতাংশ খালাসের হার বলছে না যে অভিযুক্তরা নির্দোষ — এটি বলছে যে মামলা তৈরি হচ্ছে দুর্বলভাবে, প্রমাণ সংরক্ষণে গাফিলতি হচ্ছে এবং সাক্ষীরা হয় পাওয়া যাচ্ছে না নয়তো বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। তদন্তের মান ও প্রমাণ রক্ষার শৃঙ্খল মজবুত না হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর সাজার বিধান কাগজেই থাকবে।
দ্বিতীয় বড় ঘাটতি পাচার নেটওয়ার্কের শীর্ষ পর্যায়কে ছুঁতে না পারা। প্রথম আলোকে দেওয়া এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, মাদক পাচারের মূল মদদদাতারা — যারা অর্থায়ন করেন, রাজনৈতিক সুরক্ষা দেন — এখনো নাগালের বাইরে। সাক্ষী সুরক্ষা কাঠামো, আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই চিত্র বদলাবে না।
তৃতীয়ত, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন অবকাঠামো সংকটের আকারের তুলনায় অপ্রতুল। ৮৩ লাখ ব্যবহারকারী শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয় — এটি একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি চাহিদা কমানোর কৌশল — শিক্ষা, তারুণ্য কার্যক্রম ও সহজলভ্য চিকিৎসা — যেকোনো কার্যকর মাদকবিরোধী কৌশলের অপরিহার্য অংশ।
ট্রানজিট দেশ থেকে বের হওয়ার পথ
কোকেইন ট্রানজিট করিডোর হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান, হেরোইন সরবরাহ-শৃঙ্খলে ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এবং অভ্যন্তরীণ ভোগে ইয়াবার আধিপত্য — তিনটি একসাথে চলছে এবং প্রতিটির জন্য আলাদা সাড়া দরকার। বাংলাদেশ মাদক উৎপাদক দেশ নয় — মিয়ানমার বা আফগানিস্তানের মতো এই সমস্যার মালিক নয় এটি। কিন্তু ভূগোল একে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ও ধ্বংসাত্মক শিল্পের একটি অংশীদার করে তুলেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারির ঢাকা বিমানবন্দর অভিযান একটি সতর্কবার্তা ছিল। যে পাচার নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে তাদের করিডোর হিসেবে বেছে নিয়েছে, তারা হিসাব করেছিল এটি সহজ পথ। সেই হিসাব বদলাতে হলে শুধু অভিযান ও জব্দ নয় — দশকের পর দশকের আইন ও অভিযান সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন মাদক ত্রিভুজে আটকে আছে, সেই মূল প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজতে হবে।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধটি যাচাইকৃত সরকারি তথ্য ও জনপ্রকাশ্য উৎসের ভিত্তিতে তৈরি।