স্ন্যাকস জায়ান্টের ফাঁদ: কেলগস-প্রিংলস কেলেঙ্কারি এবং বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা
২০২০ সালের মে মাসে ব্রিটিশ ফিটনেস কোচ জো উইকসের ইউটিউব চ্যানেল "পিই উইথ জো"তে একটি প্রিংলস বিজ্ঞাপন চলছিল। কোভিড লকডাউনের সেই দিনগুলোতে লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিদিন ওই চ্যানেলে ব্যায়াম করত। তারাই হয়ে উঠল কেলগসের টার্গেট। ব্রিটেনের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা অ্যাডভার্টাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি (এএসএ) অভিযোগ পেল, তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই কেলগস চুপচাপ বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিল। শাস্তি হলো না। শুধু একটা অস্বস্তিকর মিটমাট।
এই ঘটনাটা শুধু ব্রিটেনের গল্প নয়। এটা একটা নকশার গল্প — যে নকশায় বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো বারবার বিধি ভাঙে, নিয়ন্ত্রক দুর্বল হলে সুযোগ নেয়, এবং যেসব বাজারে জবাবদিহিতার কাঠামো কমজোর সেখানে সবচেয়ে বেশি দাপট দেখায়। বাংলাদেশ ঠিক সেই ধরনের একটি বাজার — বিশাল, তরুণ জনসংখ্যার, দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য।
কেলগসের ইতিহাস: বারবার একই ফাঁদ
২০২০ সালের ঘটনা বিচ্ছিন্ন ছিল না। ২০০৯ সালে মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশন কেলগসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। অভিযোগ ছিল: ফ্রস্টেড মিনি-হুইটস সিরিয়াল খেলে শিশুদের মনোযোগ ২০% বাড়ে — এই দাবিটি মিথ্যা। কোম্পানির নিজের পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ১১% শিশু সেই উন্নতি দেখিয়েছিল। বাকিদের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্যই ছিল না।
এর বছর কয়েক পরে আমেরিকার একটি ক্লাস অ্যাকশন মামলায় কেলগস ২ কোটি ডলারেরও বেশি জরিমানা দিতে রাজি হয়। শর্ত ছিল — "স্বাস্থ্যকর", "পুষ্টিকর", "সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক" জাতীয় দাবি আর ব্যবহার করা যাবে না উচ্চ চিনির পণ্যের জন্য। এই কোম্পানির রেইজিন ব্র্যান সিরিয়াল "হার্টের জন্য স্বাস্থ্যকর" বলে বাজারজাত হতো, যদিও প্রতি পরিবেশনে ছিল ১৮ গ্রাম চিনি — দৈনিক ক্যালোরির প্রায় ৪০ শতাংশ।
এটা বিপণনে সচেতন অসততার একটা চিরপরিচিত পদ্ধতি। পণ্যের ভালো উপাদান সামনে আনো, খারাপটা লুকাও। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কথা বলো কিন্তু ফাইনপ্রিন্টে বাস্তব তথ্য ঢেকে রাখো। পশ্চিমের বাজারে এসব ধরা পড়ে, বিচার হয়, আর্থিক দণ্ড হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ যেখানে দুর্বল, সেখানে এই চক্র অব্যাহত থাকে।
বাংলাদেশের বাজারে কী ঘটছে
বাংলাদেশের খাদ্যবাজার এখন প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের। ১৭ কোটি মানুষের দেশে খাদ্য নিরাপত্তা মোটামুটি অর্জিত হয়েছে — এটা সত্যিকারের সাফল্য। কিন্তু খাদ্যের গুণমান এবং বিজ্ঞাপনের নৈতিকতার চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফিউচার স্টার্টআপ ও খাস ফুড লিমিটেডের যৌথ গবেষণা "ইউ আর হোয়াট ইউ ইট: বাংলাদেশ ফুড অ্যান্ড হেলথ রিপোর্ট ২০২৫" জানাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৬ থেকে ৩০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্যজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর আর্থিক ক্ষতি বার্ষিক ৩৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। শাকসবজি ও তাজা পণ্যের ৫২ শতাংশ ভেজাল বা দূষিত বলে ২০১৯ সালের সরকারি তথ্যে উঠে আসে। আর সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি মনে করেন তারা যা খাচ্ছেন তাতে ক্ষতিকর উপাদান আছে।
এই পরিবেশের মধ্যে বৈশ্বিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে আসছে এবং সম্প্রসারিত হচ্ছে। ঢাকার সুপারশপগুলোয় প্রিংলস, কেলগস সিরিয়াল, এবং বহু পশ্চিমি স্ন্যাকস পণ্য এখন সহজলভ্য। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোর ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৮ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত দুবার ফাস্টফুড খাচ্ছেন। এদের মধ্যে ৪২ শতাংশ প্রতিদিন খাচ্ছেন।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ফাঁকফোকর
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী অত্যন্ত ডিজিটাল-সংযুক্ত। ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রাম এখন মতামত ও ভোক্তা আচরণ নির্মাণের প্রধান মঞ্চ। এখানেই বিপদ। যে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ফাঁকফোকর দিয়ে কেলগস ব্রিটেনে শিশুদের কাছে প্রিংলস বিজ্ঞাপন পাঠিয়েছিল, সেই একই ফাঁকফোকর বাংলাদেশে কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই চলছে।
ব্রিটেনে ছিল এএসএ এবং নাগরিক সমাজের চাপ। বাংলাদেশে সেই সমতুল্য ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ২০২৫ সালের একটি আইনি গবেষণাপ্রবন্ধ স্পষ্ট বলছে — বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও ই-কমার্সের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) দুটো সংস্থাই আইনগত দায়িত্বপ্রাপ্ত। ২০১৭ সালের প্যাকেজড ফুড লেবেলিং রেগুলেশন অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ, উপাদান, স্বাস্থ্য সতর্কতা সব কিছু লেখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিজ্ঞাপনে কী দাবি করা যাবে, ডিজিটাল মাধ্যমে কোন বয়সের দর্শককে কীভাবে লক্ষ্য করা যাবে — এসব প্রশ্নের উত্তর বিদ্যমান আইনে অস্পষ্ট।
নিরাপদ খাদ্যের বাজার এবং অসাম্যের গল্প
বাংলাদেশে একটি নতুন ধারা উঠে আসছে। যেসব ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা আছে, তারা সাধারণ বাজারের পণ্যের চেয়ে ২১ থেকে ৫২ শতাংশ বেশি দাম দিতে রাজি হচ্ছেন শুধু নিশ্চিত হতে যে তাদের খাবারে ভেজাল নেই। এই বাজারটি — যাকে বলা হচ্ছে সেফ ফুড সেক্টর — ২০২৫ সালে ছিল ১৪৩ মিলিয়ন ডলারের, এবং ২০৩১ সালের মধ্যে ২২৫ মিলিয়নে পৌঁছানোর পূর্বাভাস আছে।
কিন্তু এই চিত্রের অন্য পিঠ রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য মূলত ঢাকার উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের নাগালে। দেশের বাকি বেশিরভাগ মানুষ সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। খাদ্যজনিত অসুস্থতার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছেন দরিদ্র মানুষেরা — যাদের বিকল্প নেই, যারা বাজারে যা পাচ্ছেন তাই খাচ্ছেন। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো যদি এই বাজারে ভুল তথ্য দিয়ে পণ্য বেচে, তার দাম চুকাতে হয় এই মানুষদেরই।
জবাবদিহিতার শর্তগুলো কীভাবে তৈরি হবে
ব্রিটেনে কেলগসকে থামানো গিয়েছিল কারণ নাগরিক সমাজ সক্রিয় ছিল, সাংবাদিকরা রিপোর্ট করেছিলেন, এবং রেগুলেটর চাপ দিয়েছিল। বাংলাদেশে এই তিনটি স্তর আংশিকভাবে বিদ্যমান। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সিএবি) ভেজাল ও মিথ্যা লেবেলিংয়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। দ্য ডেইলি স্টার এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মতো সংবাদমাধ্যম খাদ্য নিরাপত্তাকে গুরুত্বের সাথে কভার করে। বিএফএসএ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।
কিন্তু এই তিনটি স্তরের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষত ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট মানদণ্ড দরকার — কোন পণ্য কীভাবে কোন বয়সের দর্শকদের কাছে বিজ্ঞাপন দিতে পারবে, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দাবি কতটুকু প্রমাণিত থাকতে হবে, এবং লঙ্ঘনের জন্য আর্থিক শাস্তির বিধান কী হবে।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভোক্তা সুরক্ষা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণকে সংস্কার এজেন্ডায় রেখেছে। এটা সুযোগ। কিন্তু প্রতিশ্রুতি থেকে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় পৌঁছাতে লাগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ।
কর্পোরেট নৈতিকতা ঐচ্ছিক নয়
কেলগস-প্রিংলসের গল্পটা একটি শিক্ষার গল্প। বড় ব্র্যান্ডের কাছ থেকে নৈতিক আচরণ স্বেচ্ছায় আসে না — সেটা আদায় করতে হয়। বিধি, নজরদারি, শাস্তি এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়ে। বাংলাদেশে এই কাঠামো এখনো অসম্পূর্ণ।
৩৫০ কোটি ডলারের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি — খাদ্যজনিত অসুস্থতা থেকে যার জন্ম — কোনো দৈবঘটনা নয়। এটা আংশিকভাবে নীতির ব্যর্থতা, আংশিকভাবে কর্পোরেট উদাসীনতা, এবং আংশিকভাবে ভোক্তাদের কাছে সঠিক তথ্যের অভাব। এই তিনটি সমস্যার সমাধান একসাথে না এলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
বৈশ্বিক খাদ্য ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসুক — এটা স্বাগতযোগ্য। কিন্তু তারা বাংলাদেশে যে মানের বিজ্ঞাপন দেবে, যে মানের পণ্য বেচবে, সেটা ব্রিটেন বা আমেরিকায় যে মান মেনে চলে তার চেয়ে কম হবে না — এই প্রত্যাশা রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করতে হবে।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধটি তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে আমাদের সম্পাদকীয় দলের দ্বারা তৈরি। খাদ্য নিরাপত্তা বা বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রাথমিক উৎস এবং পেশাদার পরামর্শদাতাদের সাথে যোগাযোগ করুন।