নিস থেকে ঢাকা: ম্যাক্রোঁর নীতি এবং বাংলাদেশ-ফ্রান্স কূটনীতির পরিবর্তনশীল আবহ
২০২৫ সালের মে মাসে একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা ঘটল। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ফ্রান্সের নিস শহরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সামুদ্রিক সম্মেলনের পাশে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের অনুরোধ পাঠালেন। প্যারিস ফিরিয়ে দিল। ম্যাক্রোঁর দ্বিপাক্ষিক সূচি পূর্ণ, অনেক দেশ আগেই আবেদন করেছে — এই জবাব এল। ইউনূস সফরই বাতিল করে দিলেন।
ঘটনাটা বড় নয়, কিন্তু সংকেতটা স্পষ্ট। মাত্র দুই বছর আগে ম্যাক্রোঁ নিজে ঢাকায় এসেছিলেন — ৩৩ বছরের বিরতির পর প্রথম ফরাসি রাষ্ট্রপতির সফর — এবং সেই সময় সম্পর্ককে "কৌশলগত অংশীদারিত্ব" বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এখন নতুন সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেই উষ্ণতার অভাব অনুভব করছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৩: যে সফর অনেক কিছু বলেছিল
২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ম্যাক্রোঁ ঢাকায় এলেন। নয়াদিল্লিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন শেষ করেই সরাসরি বাংলাদেশ — এই সময়সূচিটাই বলে দিচ্ছিল ফ্রান্স বাংলাদেশকে তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।
সংখ্যাগুলো বলে দেয় সম্পর্কের গভীরতা। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৯৯০-এর দশকের ২১০ মিলিয়ন ইউরো থেকে ২০২৩ সালে ৪.৯ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। ফ্রান্স বাংলাদেশি পণ্যের পঞ্চম বৃহত্তম আমদানিকারক বিশ্বে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৃতীয়। ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে তার বার্ষিক বিনিয়োগ প্রায় তিনগুণ করেছে।
সফরে যে চুক্তিগুলো হলো সেগুলো উচ্চাভিলাষী ছিল। ৮৪টি পৌরসভার উন্নয়নে ২০০ মিলিয়ন ইউরো ঋণ দিল এএফডি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১০টি এয়ারবাস বিমান কেনার চুক্তি করল। বাংলাদেশের প্রথম আর্থ অবজার্ভেশন স্যাটেলাইটের যাত্রা শুরু হলো ফ্রান্সের সহযোগিতায়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নৌ, বায়ু ও স্থল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করার অঙ্গীকার এলো।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ম্যাক্রোঁর "কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের" দৃষ্টিভঙ্গিকে বাংলাদেশের নিজস্ব বিদেশনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করলেন। এই মন্তব্যটা অর্থবহ ছিল — কারণ উভয় দেশই কোনো একটি মহাশক্তির অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজের পথে চলতে চায়।
ফ্রান্সের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশ
ফ্রান্সের বাংলাদেশে আগ্রহ কোনো আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত নয়। ফ্রান্সের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি সুচিন্তিত অংশ। ফ্রান্সের ভারত মহাসাগরে নিজস্ব ভূখণ্ড রয়েছে — এটি একটি ইউরোপীয় দেশ হওয়ার পাশাপাশি সত্যিকার অর্থেই একটি ভারত মহাসাগরীয় শক্তি।
বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব এই হিসাবে অপরিহার্য। দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রপথ এই অঞ্চলের ভেতর দিয়ে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো চায় বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে কোনো একটি মেরুর প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না হোক — এবং এই লক্ষ্যে নিজেদের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করতে এএফডির ঋণ, এয়ারবাসের বিমান বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ব্যবহার করছে।
২০২৪-এর পরিবর্তন এবং কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পড়ে গেল। ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সরকারি চাকরিতে কোটার বিরোধে শুরু হওয়া আন্দোলন রূপান্তরিত হলো কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহে। হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলেন। তিন দিন পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিলেন।
ফ্রান্সের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল উষ্ণ। ম্যাক্রোঁ ইউনূসকে ব্যক্তিগত চিঠিতে অভিনন্দন জানিয়ে লিখলেন: "এই জটিল সময়ে জেনে রাখুন, ফ্রান্সের পূর্ণ সমর্থন আপনার সঙ্গে আছে।" মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বললেন তিনি। ফরাসি রাষ্ট্রদূত ঢাকায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন এবং জানালেন ম্যাক্রোঁ ইউনূসকে ফ্রান্স সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্যারিসে দুই সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উৎসবেরও পরিকল্পনা হলো। কথায় সব ঠিকঠাক মনে হচ্ছিল।
কিন্তু মে ২০২৫-এর নিস ঘটনা ভিন্ন বার্তা দিল। ইউনূস সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তিনি পাশাপাশি বৈঠকও চেয়েছিলেন — এবং সেটা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর পুরো সফরই বাতিল। এই সিদ্ধান্তটা কূটনৈতিক মহলে একটি উল্লেখযোগ্য সংকেত হিসেবে পড়া হলো।
প্রত্যাখ্যানের পেছনে কী
ফ্রান্সের এই অবস্থানের কয়েকটি ব্যাখ্যা সম্ভব।
সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যা: সময়সূচির সমস্যা। একটি বৈশ্বিক সম্মেলনে ডজন ডজন রাষ্ট্রপ্রধান এলে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এটা সত্যি হতে পারে।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: বৈধতার প্রশ্ন। ইউনূস একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রশ্নে সচেতন ফ্রান্স — বিশেষত যখন ম্যাক্রোঁ নিজেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন — একজন অনির্বাচিত বিদেশি নেতার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি-পর্যায়ের সাক্ষাতের বিষয়ে সংযত থাকতে পারে।
তৃতীয় ব্যাখ্যা সবচেয়ে কূটনৈতিকভাবে সূক্ষ্ম। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানতে চেয়েছিল — এই বৈঠকে বাংলাদেশ কী চায়? রিপোর্ট বলছে, তারা বৈঠককে নিছক প্রতীকী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে দিতে রাজি ছিল না। অর্থাৎ ফ্রান্স বুঝতে পেরেছিল যে ইউনূস এই বৈঠকটাকে বৈশ্বিক বৈধতার বার্তা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন — এবং সেই ব্যবহার ফ্রান্সের স্বার্থে নয়।
বাংলাদেশের বিদেশনীতির নতুন অধ্যায়
এই ঘটনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। হাসিনার পতনের পর ঢাকা সক্রিয়ভাবে নিজেকে বিশ্ব মঞ্চে পুনঃপরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে — এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন যারা আগের সরকারের সঙ্গে দূরত্ব রেখেছিল, নতুন বিনিয়োগকারী ও অংশীদারদের সামনে স্থিতিশীলতার বার্তা পৌঁছানো।
ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রথমবার বৈঠক করলেন — যা ছিল দুই নেতার মধ্যে প্রথম মুখোমুখি আলোচনা। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জোর দিলেন "সুষম" বিদেশনীতির ওপর — কোনো মহাশক্তির প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে না পড়া।
এই প্রেক্ষাপটে ম্যাক্রোঁর সঙ্গে একটি বৈঠক সরাসরি কূটনৈতিক মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি প্রতীকী মূল্য বহন করত। ফ্রান্স নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান শক্তি, এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারদের একটি। ফ্রান্স যে প্রত্যাখ্যান করল — প্রক্রিয়াগত ভাষায় হলেও — সেটা বলে দেয় বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে এখনো ইউরোপীয় শীর্ষ কূটনীতিতে নিজের জায়গা তৈরিতে অনেক পথ হাঁটতে হবে।
কাঠামোগত সম্পর্ক টেকসই
কূটনৈতিক আবহ যাই হোক, বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্কের কাঠামোগত ভিত্তি শক্ত। ফ্রান্স বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাজার — এবং পোশাক শিল্প বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। ফরাসি উন্নয়ন অর্থায়ন পৌরসভা পরিকাঠামো ও জলবায়ু অভিযোজনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে — এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি।
২০২৫ সালের জাতিসংঘ সামুদ্রিক সম্মেলন — যেটি ফ্রান্স ও কোস্টারিকা যৌথভাবে আয়োজন করছে — টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৪ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের গভীর স্বার্থ রয়েছে। এই ইস্যুতে ফ্রান্সের নেতৃত্বের সুবিধা নেওয়া থেকে বিরত থাকা বাংলাদেশের পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো — ২০২১ ও ২০২৩-এ যা সুনির্দিষ্ট হয়েছে — বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সক্ষমতা বিনির্মাণের অংশ। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অভিযানে সর্বোচ্চ সৈন্যদানকারী দেশগুলোর একটি। এই অবদানের ভূকৌশলগত তাৎপর্য ফ্রান্স উপেক্ষা করার অবস্থানে নেই।
সামনের পথ
বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক ২০২৫ সালে একটি সন্ধিক্ষণে। আর্থিক ও উন্নয়নমূলক সম্পর্কের কাঠামো মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী। রাজনৈতিক সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে এগিয়ে নেওয়া। নির্বাচনের সুস্পষ্ট পথরেখা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি, এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার — এই বিষয়গুলোই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় শীর্ষ কূটনীতিতে কতটা গুরুত্ব পাবে।
ফ্রান্সের জন্য বাংলাদেশ একটি মূল্যবান কৌশলগত অংশীদার। সম্পর্ক শীতল হতে দিলে বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক এবং উন্নয়নমূলক খরচ হবে। নিসের ঘটনাটি ছোট ছিল, বিপর্যয়কর নয়। কিন্তু এটা মনে করিয়ে দিচ্ছে — কূটনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা ধীরে গড়ে ওঠে, এবং হারিয়ে যায় অনেক দ্রুত।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। এই নিবন্ধটি তথ্যমূলক ও বিশ্লেষণমূলক উদ্দেশ্যে আমাদের সম্পাদকীয় দলের দ্বারা তৈরি।