আঠারো মাস ক্লাসরুম ছাড়া

২০২০ সালের ১৭ মার্চ বাংলাদেশ দেশের সব স্কুল বন্ধ করে দিল। যা সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল তা চলল আঠারো মাস — বিশ্বের দীর্ঘতম মহামারি-সংক্রান্ত স্কুল বন্ধের একটি। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল অবশেষে খুললে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশু এমন ক্লাসরুমে ফিরল যা যা হারিয়ে গেছে তার পুরোপুরি হিসাব রাখতে পারেনি। আর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ওমিক্রন ঢেউ সামলাতে সরকার আরো এক মাসের জন্য আবার বন্ধ করে দিল।

এই সময়কালের যে সংখ্যাগুলো বেরিয়ে এসেছে সেগুলো বিমূর্ত শিক্ষা পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের একটি প্রজন্মের শিশুর গল্প — যাদের ভিত্তিগত শিক্ষা, পড়া, গণনা আর জ্ঞানীয় বিকাশ ঠিক সেই সময়ে ব্যাহত হয়েছে যখন এটা হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের স্কুলে COVID-19-এর সময় কী ঘটেছিল এবং ক্ষতি সক্রিয়ভাবে মেরামত না করলে এর মূল্য কী হবে — এটা দেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নীতির প্রশ্নগুলোর একটি।

আঠারো মাস স্কুলের বাইরে থাকার আসল মানে

মহামারি আসার আগেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী অবস্থায় ছিল না। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৭ সালের তথ্য দেখাচ্ছিল প্রাথমিক শেষ করা বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি শিশু একটি সাধারণ পাঠ্য পড়ে বুঝতে পারে না। মহামারি-পূর্ব লার্নিং অ্যাডজাস্টেড ইয়ারস অব স্কুলিং — যা উপস্থিতির সময় এবং প্রকৃত শিক্ষার মান উভয়ই বিবেচনা করে — নামমাত্র ১০.২ বছর স্কুল করা একটি শিশুর ক্ষেত্রে প্রায় ৬ বছরে দাঁড়িয়েছিল।

মহামারি এটাকে আরো খারাপ করেছে এবং সিমুলেশন এখন অস্বস্তিকর নির্ভুলতায় সেটা পরিমাপ করেছে। বিশ্ব ব্যাংক অনুমান করেছে COVID-19 স্কুল বন্ধ গড় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ০.৫ থেকে ০.৯ বছরের শিক্ষার ক্ষতি করবে। নয় মাসের কার্যকর বন্ধের মধ্যম পরিস্থিতিতে LAYS ৬ থেকে ৫.৩ বছরে নামবে। UNICEF-এর আরো উদ্বেগজনক প্রজেকশন বলছে বন্ধের ফলে ৭৬ শতাংশ বাংলাদেশি শিশু প্রাথমিক শেষে ন্যূনতম পাঠযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হবে — মহামারির আগের ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে।

একজন শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ব ব্যাংক হিসাব করেছে গড় বাংলাদেশি শিশু শ্রমবাজারে প্রবেশ করলে বার্ষিক আয়ে প্রায় ৩৩৫ ডলারের ঘাটতির মুখে পড়বে — বার্ষিক আয়ের প্রায় ৬.৮ শতাংশ। সব শিক্ষার্থীর জন্য একত্রিত করে দশ বছর সামনে প্রজেক্ট করলে দেশের অর্থনীতিতে এর মূল্য নেট বর্তমান মূল্যে ১১৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত GDP ক্ষতি।

কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

বাংলাদেশে স্কুল বন্ধ সব শিশুকে সমানভাবে প্রভাবিত করেনি। মহামারির শিক্ষাগত ক্ষতি বিদ্যমান বৈষম্যের রেখা ধরে চলেছে — গ্রামীণ বনাম শহুরে, গরিব বনাম কম গরিব, মেয়ে বনাম ছেলে — আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে বড় করেছে।

মেয়েদের জন্য পরিণতি বিশেষভাবে গুরুতর ছিল। স্কুল বন্ধ হলে এবং পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপে পড়লে অনেক গ্রামীণ পরিবারের হিসাব মেয়েদের স্কুলে রাখার বিপক্ষে গেল। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২১-এ মাধ্যমিকে মেয়ে শিক্ষার্থীদের সমাপ্তির হার কমেছে এবং ঝরে পড়ার হার প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। বন্ধের সময় বড় অংশের মেয়ে বিয়ে হয়ে গেছে। বাল্যবিবাহ — যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদের স্থায়ীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেয় — মহামারির বছরগুলোতে পরিমাপযোগ্যভাবে বেড়েছে।

গরিব পরিবারের ছেলেদের জন্য চাপটা ভিন্ন রূপ নিল। লকডাউনে পারিবারিক আয় কমায় অনেককে কর্মক্ষেত্রে টেনে নিল। ৪০৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর একটি জরিপে ৭৬ শতাংশ জানিয়েছে মহামারির কারণে তাদের পরিবারের আয় কমেছে। চট্টগ্রামের এক ১৭ বছরের কিশোরের কথায় — কোনো আয় আসছিল না, আর স্কুলে থাকা অসম্ভব মনে হচ্ছিল।

ডিজিটাল বিভাজন আরেকটি বৈষম্যের স্তর যোগ করল। বাংলাদেশের দূরশিক্ষণ সাড়া — টিভি সম্প্রচার, প্রি-রেকর্ডেড ক্লাস, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম — শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের কাছে মোটামুটি পৌঁছেছে। গ্রামের শিশুদের কাছে যেখানে ইন্টারনেট নেই, টেলিভিশন নেই, বা একটি ডিভাইস ভাগাভাগি করতে হয় — দূরশিক্ষণ মূলত কাগজে কলমেই ছিল।

বাংলাদেশের দূরশিক্ষণ সাড়া — কী কাজ করেছে, কী করেনি

স্কুল বন্ধের পর সরকারের সাড়া অনেকের প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ছিল। এপ্রিল ২০২০-এর মধ্যেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় "আমার ঘরে আমার স্কুল" চালু করেছিল — জাতীয় টেলিভিশনে প্রি-রেকর্ডেড পাঠ সম্প্রচারের কর্মসূচি। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো। শিক্ষক প্রশিক্ষণ অনলাইনে গেল। বিশ্ব ব্যাংক ২৫ লাখ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীকে — ৯ লাখ ছেলে ও ১৬ লাখ মেয়েকে — উপবৃত্তি ও বেতন সহায়তা দিয়েছে। গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশনের অর্থায়নে ১৪.৮ মিলিয়ন ডলারের COVID-19 স্কুল সেক্টর রেসপন্স প্রকল্প চালু হলো।

কিন্তু এই হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে একাডেমিক গবেষণা একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দূরশিক্ষণ সরাসরি শিক্ষার তুলনায় অনেক কম প্রকৃত শিক্ষা দিয়েছে। শিক্ষক বা শিক্ষার্থী — কেউই ভার্চুয়াল শিক্ষায় আত্মবিশ্বাসী ছিল না। অবকাঠামো যে জনগোষ্ঠীকে সেবা দেওয়ার কথা ছিল তার জন্য অপর্যাপ্ত ছিল।

যে শিক্ষার ক্ষতি স্থায়ী হয়ে গেছে

মহামারি স্কুল বন্ধ নিয়ে বৈশ্বিক শিক্ষা গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক অনুসন্ধান হলো সক্রিয়ভাবে মোকাবেলা না করলে কী ঘটে। একটি তৃতীয় শ্রেণির শিশু যে মহামারিতে এক বছর স্কুল হারিয়েছে সে দীর্ঘমেয়াদে তিন বছর পর্যন্ত শিক্ষার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে — কারণ পড়া ও গণনায় ভিত্তিগত ঘাটতি শ্রেণি অগ্রগতির সাথে যৌগিকভাবে বাড়ে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এই যৌগিক প্রভাব ঠেকানোর প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক শিক্ষা অবকাঠামো ছাড়াই মহামারি-পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব ২০২২ সালের শেষে সাংবাদিকদের বললেন শিক্ষার ক্ষতি পুরোপুরি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। শিক্ষা অধিকার কর্মীরা বললেন ২০২২ সালের পরিস্থিতি ২০২১-এর মতোই — শিক্ষায় বিনিয়োগে কোনো অর্থবহ উন্নতি নেই, জমে থাকা শিক্ষার ঘাটতি মোকাবেলায় কোনো গুরুতর সরকারি উদ্যোগ নেই।

UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী বন্ধের পর তৃতীয় শ্রেণির মাত্র ৩৪ শতাংশ শিশুর ভিত্তিগত পাঠ দক্ষতা ছিল। মাত্র ১৮ শতাংশের ভিত্তিগত গাণিতিক দক্ষতা ছিল। গত বছর ঝরে পড়া শিশুদের মধ্যে মাত্র ২৯ শতাংশের ভিত্তিগত পাঠ দক্ষতা ছিল, যেখানে স্কুলে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে ৩৯ শতাংশ। যারা শিক্ষার সাথে সংযুক্ত ছিল আর যারা ছিটকে পড়েছে তাদের মধ্যে ব্যবধান ইতিমধ্যে পরিমাপযোগ্য এবং উল্লেখযোগ্য।

পুনরুদ্ধারে আসলে কী দরকার

মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে বৈশ্বিক শিক্ষার প্রমাণ স্পষ্ট: নির্দিষ্ট শিক্ষার ঘাটতি লক্ষ্য করা কাঠামোবদ্ধ প্রতিকারমূলক কর্মসূচি, বর্ধিত স্কুলের সময়, সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য টিউটরিং সহায়তা, আর ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের — বিশেষত মেয়েদের — বিয়ে বা কর্মক্ষেত্রের বদলে স্কুলে রাখার আর্থিক প্রণোদনা। এগুলো জটিল হস্তক্ষেপ নয়। ব্যয়বহুল — এবং টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাজেট প্রতিশ্রুতি দরকার।

বাংলাদেশ মহামারি-পরবর্তী পরিকল্পনায় মিশ্র শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২২ সালে নতুন জাতীয় পাঠ্যক্রম পাইলট শুরু হয়েছে। উপবৃত্তি কর্মসূচি অব্যাহত আছে। কিন্তু শিক্ষা কর্মীরা ধারাবাহিকভাবে বলছেন বিনিয়োগের মাত্রা ক্ষতির স্কেলের তুলনায় অপর্যাপ্ত, আর শিক্ষার মানের জন্য জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল।

ক্লাসরুম খুলেছে। কিন্তু ক্লাসরুম খোলা আর শিক্ষা পুনরুদ্ধার এক কথা নয়। ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশু যাদের শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে তাদের জন্য — আর একটি প্রাক-বিদ্যমান শিক্ষা সংকট যা মহামারি আরো গভীর করেছে তার জন্য — পদক্ষেপ না নিলে মূল্য চোকাতে হবে দেশের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, রপ্তানি প্রতিযোগিতায়, আর জনতাত্ত্বিক সুযোগে — যা নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে।

win-tk.org হলো wintk-এর একটি প্রকাশনা — তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণী সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন কভার করে।