২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুল দখলের চার বছর পরও আফগানিস্তানের সংকট থামেনি। বরং এটি এমন এক অবস্থায় এসে থমকে আছে যা সামলানো আরও কঠিন — আন্তর্জাতিকভাবে অস্বীকৃত একটি সরকার ৪ কোটি মানুষকে শাসন করছে, ২ কোটি ২৯ লক্ষ আফগানের মানবিক সহায়তা দরকার, সীমান্তের ভেতরে দুই ডজনেরও বেশি সক্রিয় সন্ত্রাসী সংগঠন কাজ করছে — আর এশিয়ার প্রতিটি বড় শক্তির ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এই দেশটির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ কাবুল থেকে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে, আফগানিস্তানের সঙ্গে কোনো সীমান্ত নেই, কোনো সামরিক জোটেও নেই — তাহলে কি এটা সত্যিই বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়? তথ্য বলছে, অবশ্যই।

চার বছরে আফগানিস্তান কোথায় দাঁড়িয়ে

তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে আফগানিস্তানের অর্থনীতি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংকুচিত হয়েছে। ২০২৫ সালের আফগানিস্তান মানবিক চাহিদা ও সাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ কোটি ৪৮ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নেই, ১ কোটি ৪৩ লক্ষ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে আছেন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ২০২৫ সালের শুরুতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অভাবে শীতকালে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা আফগানদের প্রায় অর্ধেকের কাছে রেশন পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ দল ২০২৫ সালের শুরুতে রিপোর্ট করেছে যে আফগানিস্তানের ভেতরে দুই ডজনেরও বেশি সন্ত্রাসী সংগঠন সক্রিয় আছে — যা "দেশটির স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মধ্য ও অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।" আইএসআইএস-খোরাসান সবচেয়ে বড় আঞ্চলাতিক সন্ত্রাসী হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, ইউরোপে হামলা চালিয়েছে, মধ্য এশিয়া থেকে সদস্য সংগ্রহ করছে। আল-কায়েদা তালেবানের নীরব সমর্থনে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও নিরাপদ আশ্রয় বজায় রেখেছে বলে গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ২০২২ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আফগান মাটি থেকে অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে — যার পরিণতিতে অক্টোবর ২০২৫-এ পাকিস্তান খোস্ট, কুনার ও পাকতিকায় বিমান হামলা চালায়।

কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা যতটা প্রত্যাশিত ছিল ততটা হয়নি। চীন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম দেশ হিসেবে তালেবানের নিয়োগ করা রাষ্ট্রদূতকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে। আগস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাত একই কাজ করেছে। রাশিয়ার পার্লামেন্ট তালেবানকে নিষিদ্ধ তালিকা থেকে সরাতে সুপ্রিম কোর্টকে অনুমতি দেওয়ার আইন পাস করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো যখন নারীর অধিকার ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকে সম্পৃক্ততার শর্ত বানাতে চাইছে, চীন-রাশিয়া-মধ্য এশিয়া প্রকাশ্যে একটি ভিন্ন অবস্থান নিচ্ছে।

আফগানিস্তান-বাংলাদেশ নিরাপত্তা সংযোগ

আফগানিস্তানে কী হচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তার সম্পর্ক কাল্পনিক নয়, ঐতিহাসিক নয় — এটি সক্রিয় ও নথিভুক্ত একটি হুমকির পথ, যা মতাদর্শ প্রেরণ, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং আফগান সংঘাত যে র‍্যাডিকালাইজেশন পাইপলাইন তৈরি করেছে তার মাধ্যমে প্রবাহিত।

১৯৭৯-৮৯ সালের সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে আনুমানিক এক হাজার বাংলাদেশি স্বেচ্ছাসেবক মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন, ফিরে এসেছিলেন রণকৌশল, বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞতা এবং সালাফি-জিহাদি মতাদর্শ নিয়ে। সেই প্রজন্মই নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের জঙ্গি সাংগঠনিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে — জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ। জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান মাওলানা আবদুর রহমান প্রকাশ্যে বলেছিলেন তালেবান তার আদর্শ, আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা বাংলাদেশে ৩০০টি স্থানে একযোগে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণ ছিল সেই মতাদর্শেরই প্রকাশ।

এরপর আসে তৃতীয় প্রজন্ম। ২০১৪ সালে আয়মান আল-জাওয়াহিরি প্রতিষ্ঠিত আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) এই অঞ্চলের জিহাদি গোষ্ঠীগুলো একত্রিত করেছে, যার মধ্যে আফগান তালেবান-সংশ্লিষ্ট যোদ্ধারাও ছিলেন। এর বাংলাদেশি শাখা আনসার আল-ইসলাম ২০১৩-২০১৬ সালে ধারাবাহিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক ও কর্মীদের হত্যা করেছে। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারির হামলা — যেখানে জাপানি, ইতালিয়ান ও ভারতীয়সহ ২২ জন জিম্মি নিহত হন — চালিয়েছিল নব্য-জেএমবি, যারা আফগানিস্তানে আইএসআইএস-খোরাসানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল।

আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী দুর্বলতা

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম কাঠামোগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দ্য ডিপ্লোম্যাট ২০২৫ সালের আগস্টে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছে — অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক প্রশাসনের কাঠামো ভাঙতে গিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয়ভাবে দুর্বল করেছে। অভিজ্ঞ সন্ত্রাসবিরোধী পেশাদারদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে অপ্রাসঙ্গিক পদে, অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

পরিণতি পরিমাপযোগ্য। জুলাই ২০২৫-এ তেহরিক-ই-তালেবানের সঙ্গে সংযোগের সন্দেহে দুজন গ্রেফতার হয়েছেন। জুন ২০২৫-এ মালয়েশিয়া ৩৬ জন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আইএসআইএসের সঙ্গে সংযোগের অভিযোগে মামলা করেছে — বিদেশে শ্রম অভিবাসনের পথ যে র‍্যাডিকালাইজেশনের মাধ্যম হতে পারে তার বাস্তব প্রমাণ। ডিসেম্বর ২০২৫-এ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বিস্ফোরণে চারজন আহত হন; পুলিশ প্রায় ২৫০ কিলোগ্রাম বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে।

রাজনৈতিক মাত্রাটিও উদ্বেগজনক। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ — যার ছাত্র শাখার জঙ্গি বাস্তুসংস্থানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সংযোগ আছে এবং যার সমান্তরাল অর্থনৈতিক কাঠামো বার্ষিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার মুনাফা করে বলে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বিশ্লেষণ করেছেন — প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবাদী মামলায় বিচারাধীন একজন ধর্মীয় নেতাকে জামায়াত নির্বাচনী মনোনয়ন দিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার জ্যামিতি: ঢাকার কী মানে

আফগানিস্তানের অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ায় সরাসরি সামরিক উপায়ে নয়, বরং কাঠামোগত পথে ছড়িয়ে পড়ে। আফগানিস্তান বিশ্বের আফিম উৎপাদনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সরবরাহ করে — এই মাদকের অর্থনীতি সন্ত্রাসী অর্থায়নের সঙ্গে মিলিত আন্তঃদেশীয় অপরাধ নেটওয়ার্ক তৈরি করে। পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত — যা ২০২৫ সালে খোলামেলা সামরিক সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে — এমন একটি পাকিস্তানকে অস্থির করে যার তিন দিক দিয়ে বাংলাদেশকে ঘেরা ভারতের সঙ্গে নিজস্ব উত্তেজনাও রয়েছে।

বাংলাদেশের বার্ষিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি শিল্প, প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স প্রবাহ — এসব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সরাসরি সুবিধাভোগী। একটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা অবনতি যা আন্তর্জাতিক বীমা প্রিমিয়াম বাড়ায়, ক্রেতাদের আঞ্চলিক সোর্সিং থেকে সরিয়ে দেয়, বা গন্তব্য দেশে শ্রম বাজারে বিধিনিষেধ আনে — তা এমন একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি যা কোনো প্রান্তিক এফডিআই পরিসংখ্যান সামাল দিতে পারবে না।

ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্য

বাংলাদেশ তালেবানের ইসলামিক এমিরেটকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়নি। ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অ-হস্তক্ষেপ ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর প্রতি জোরের নীতি অনুসরণ করছে। এটি বাংলাদেশের আকার ও কৌশলগত ওজনের জন্য একটি যৌক্তিক অবস্থান। কিন্তু আফগানিস্তানের গতিপ্রকৃতি যে নির্দিষ্ট হুমকির পথ তৈরি করে, তা মোকাবেলায় ক্রমশ অপর্যাপ্ত।

লাউই ইনস্টিটিউট ২০২৫ সালের শেষ দিকে বিশ্লেষণ করেছে যে আগামী সময়ে তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হবে — চীন ও রাশিয়া তালেবানের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পৃক্ততার পক্ষে, আমেরিকা গোয়েন্দা ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করছে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিয়ন্ত্রণ বনাম সহযোগিতার খরচ মাপছে। বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতার মাঝে নির্দিষ্ট অবস্থান ছাড়াই বসে আছে — চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক আবার পশ্চিমা উন্নয়ন অংশীদারিত্বও বজায় রেখে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন নাটকীয় কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস নয়। প্রয়োজন নিরাপত্তা নীতির পুনর্মূল্যায়ন — সন্ত্রাসবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তা-আদান-প্রদান ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আফগানিস্তান বিষয়ক দোহা প্রক্রিয়াসহ বহুপাক্ষিক মঞ্চে গঠনমূলকভাবে অংশ নেওয়া। নিষ্ক্রিয়তা নিরপেক্ষতা তৈরি করে না — এটি শূন্যতা তৈরি করে যা কাবুলের জিহাদি ঐতিহ্য থেকে আসা সংগঠনগুলো এবং যারা কখনো আফগানিস্তানে না গিয়েও সেই মতাদর্শ গ্রহণ করেছে তারা পূরণ করতে সক্ষম।

এফআর২৪ নিউজ ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিষয়াবলি কভার করে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের সংবাদ ও বিশ্লেষণ বিভাগ দেখুন।