দশ দিনে তারেক রহমান: প্রতিশ্রুতি বড়, পরীক্ষাও বড়
সতেরো বছর লন্ডনে কাটিয়েছেন, দূর থেকে বাংলাদেশ দেখেছেন। এখন তারেক রহমান ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসে আছেন — আর বাংলাদেশ তাঁকে দেখছে। আশা, সংশয়, আর অধৈর্যের মিশেলে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ঐতিহাসিক দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে — ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টি। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৮৮ শতাংশ, যা দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা স্বীকার করেছেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিলেন তারেক রহমান।
এখন প্রশ্ন একটাই — পরের নব্বই দিনে কী হবে?
১৮০ দিনের পরিকল্পনা: উচ্চাভিলাষী, তবে চাপের মুখে
শপথের পরপরই সরকার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। চারটি বিষয় সবার আগে: আইন-শৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং দুর্নীতি দমন।
জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে তারেক রহমান বলেছেন, "আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতির কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।" জ্বালানি পরিকল্পনায় আছে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন এবং ২০২৬-৩০ মেয়াদে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি মহাপরিকল্পনা তৈরি।
বাংলাদেশের ৮ কোটি ২০ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য এটি শুধু নীতিকথা নয় — ২০২৫ সালজুড়ে লোডশেডিং ভোগ করা মানুষগুলোর কাছে বিদ্যুৎ মানে বেঁচে থাকা।
অর্থনীতি: পুনরুদ্ধারের পথে নতুন ধাক্কা
তারেক রহমান একটি নাজুক কিন্তু উন্নতিশীল অর্থনীতি পেয়েছেন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার কষ্টকর কিন্তু জরুরি স্থিতিশীলতা আনতে সফল হয়েছিল। মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশের উপর থেকে নামতে শুরু করেছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফ সহায়তায় কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল।
তারপর ২৫ ফেব্রুয়ারি এলো সেই খবর — বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়া হলো। তিনি খবরটা জানলেন টেলিভিশনে দেখে। তাঁর জায়গায় এলেন গার্মেন্ট উদ্যোক্তা মোস্তাকুর রহমান — কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই যাঁর।
ব্লুমবার্গ এটিকে বলেছে "বিস্ময়কর প্রস্থান"। এশিয়া টাইমস লিখেছে, নতুন সরকার এমন "সুনামের পুঁজি ঝুঁকিতে ফেলেছে যা অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিল।" বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনও ভঙ্গুর, আর নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা হারাবে — সেই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে এই পরিবর্তন অনেক প্রশ্ন তুলেছে।
সংবিধান সংস্কার: ঘড়ির কাঁটা চলছে
নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের উপর গণভোট। ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছেন। সনদে আছে: দ্বিকক্ষীয় সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা, নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।
কিন্তু সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই বিএনপি সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে অস্বীকার করেন। আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছিল — পরিষদ এখনও সংসদে অনুমোদিত হয়নি। কিন্তু বিরোধী দল ও সংস্কার সমর্থকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
পরে সালাহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট করেন যে বিএনপি সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু যে তরুণ প্রজন্ম এই সংস্কারের স্বপ্ন দেখে, তারা শুধু কথা চায় না — চায় কাজ।
বৈদেশিক নীতি: "বাংলাদেশ ফার্স্ট" বাস্তবে কতটা সম্ভব
কাগজে বিএনপির বৈদেশিক নীতির কথা সহজ — বাংলাদেশ প্রথম। কিন্তু বাস্তবতা জটিল।
নির্বাচনের ফলাফলের পর সবার আগে শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই নেতা ফোনে কথা বলেন, দিল্লি সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এখনও একটি কাঁটা। দেশের মানুষের একটি বড় অংশ ভারত-বিরোধী মনোভাব নিয়ে আছে। তারেক রহমানকে এই দুই চাপের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
ডিসেম্বর ২০২৬-এ গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এটি একা-ই বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের উন্নয়নে গভীরভাবে যুক্ত — বন্দর, যোগাযোগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ নিয়ে। ওয়াশিংটন, বেইজিং, দিল্লি — তিনটির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে এমনভাবে যাতে কেউ না ভাবে সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়ে গেছে।
তরুণ প্রজন্ম: যাদের ধৈর্যের সীমা আছে
২০২৪ সালে যে প্রজন্ম শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছিল, তারা এখন বাইরে বসে দেখছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ তরুণ ভোটারের প্রত্যাশা অনেক বড়।
বিএনপির ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ছিল — ১ কোটি কর্মসংস্থান, পারিবারিক কার্ড, কৃষক কার্ড, স্কুলে মিড-ডে মিল ফেরানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার। এগুলো শুধু প্রতিশ্রুতি নয় — এগুলো দিয়েই ম্যান্ডেট কেনা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাইয়েদ মুর্শিদ পরামর্শ দিয়েছেন — বড় পরিকল্পনা মাথায় রেখে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য ছোট ছোট প্রকল্পে মনোযোগ দিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি বলেছেন, "চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন, আইন-শৃঙ্খলা এবং জনসুরক্ষা নিশ্চিত করা — এটাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল।"
দশ দিনে যা বোঝা গেল
তারেক রহমানের প্রথম দশ দিন আশাব্যঞ্জক এবং উদ্বেগজনক — দুটোই। ১৮০ দিনের পরিকল্পনা গভীরতার ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচন নিজেই একটি গণতান্ত্রিক অর্জন। সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কার্যকর রয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরখাস্তের ঘটনা অপ্রয়োজনীয় বার্তা দিয়েছে। সংস্কার পরিষদের শপথ প্রত্যাখ্যান শুরুতেই অনাস্থার ছায়া তৈরি করেছে। আর নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতায় আসা একজন নেতার কাঁধে ভারটা যে কোনো মানদণ্ডেই অসাধারণ।
বাজারে চালের দাম কমল কিনা, বিদ্যুৎ ঠিকমতো থাকল কিনা, ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ কিনা — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে আগামী নব্বই দিন। বিশ্লেষকের রায়ের জন্য অপেক্ষা করবে না বাংলাদেশ।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক বিষয়ে স্বাধীন সংবাদের জন্য ভিজিট করুন win-tk.org। যোগাযোগ: editor@win-tk.org