এপ্রিলের ছয় ম্যাচ, হিসাব মেটানোর সুযোগ

বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন যে ভার আছে সেটা প্রতিপক্ষের তৈরি করা নয়। জানুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে একটা অস্বস্তি দলের চারপাশে ঘুরছে। ভারতে খেলতে না যাওয়া, আইসিসির কাছে নিরপেক্ষ ভেন্যুর আবেদন, প্রত্যাখ্যান, এবং শেষমেশ স্কটল্যান্ডের বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপ খেলা — এই ঘটনার ধারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা এখনও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। আইসিসি কোনো শাস্তি দেয়নি। কিন্তু সুনামের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা শাস্তির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

এই পরিস্থিতিতে এপ্রিলে নিউজিল্যান্ড আসছে তিনটি ওডিআই ও তিনটি টি-টোয়েন্টি নিয়ে। কাগজে একটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ, বাস্তবে এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের নিজেকে পুনরায় প্রমাণের মঞ্চ। ২০২১ সালে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডকে ওডিআইয়ে হারিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৩ সালেও। পরপর দুটো সিরিজ জয়ের এই ধারা ধরে রাখার সুযোগ এখন সামনে। প্রশ্ন হলো — দলের মনোযোগ কি এখন মাঠে, নাকি বিশ্বকাপ প্রসঙ্গের রেশ এখনও টানছে?

প্রিমিয়ার লিগ ট্রান্সফার যুদ্ধ: দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ভক্তদের দৃষ্টিতে

সিরিজের সময়সূচি যেভাবে সাজানো

নিউজিল্যান্ডের সফরে আগে তিনটি ওডিআই, পরে তিনটি টি-টোয়েন্টি। ওডিআই পর্বটা সম্ভবত ঢাকার মিরপুরে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হবে। টি-টোয়েন্টি পর্বের জন্য চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে যাওয়ার কথা। বিসিবি এখনও নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি, তবে এপ্রিলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে সিরিজ মাঠে গড়ানোর কথা — মার্চে পাকিস্তান সিরিজ শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই।

এই ব্যবধানটা ছোট হওয়াটা সমস্যার। পাকিস্তান আসছে দুটো টেস্ট, তিনটি ওডিআই ও তিনটি টি-টোয়েন্টি নিয়ে। এত ম্যাচের পর শরীর ও মন দুটোতেই টান পড়বে স্বাভাবিকভাবেই। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ড সিরিজ শুরু হওয়া মানে খেলোয়াড়দের ওয়ার্কলোড ব্যবস্থাপনায় বিসিবিকে সতর্ক থাকতে হবে। বিষয়টা দলের ভেতরে বরাবরই একটু স্পর্শকাতর। মিচেল স্যান্টনারের দল হোটেলে পৌঁছানোর আগেই সেই পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে।

ব্যাটিংয়ের সেই পুরনো সমস্যা

ফিল সিমন্স হেড কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে — ব্যাটিং লাইনআপে কাঠামো আনা, শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভার উপর নির্ভরতা কমানো। শন টেইট এসেছেন পেস বোলারদের গড়তে। মুশতাক আহমেদ স্পিনারদের শাণিত করতে। কোচিং প্যানেল যোগ্য লোকেই ভরা। কিন্তু মিডল অর্ডারের যে চরিত্র — চাপে পড়লে গুটিয়ে যাওয়া — সেটা এখনও বদলায়নি।

তাওহিদ হৃদয়ের দিকে সবার চোখ। সম্ভাবনা আছে, মাঝে মাঝে সেটা ঝলক দেখায়। কিন্তু মানসম্পন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুরো সিরিজজুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স — সেটা এখনও দেখায়নি। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে, নিজেদের সুবিধার পিচে — এটাই সেই সুযোগ। এখানে ভালো না করলে নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসবে।

টি-টোয়েন্টিতে ইনিংস ওপেন করতে তানজিদ হাসান আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে আসেন, আধুনিক সাদা বলের ক্রিকেটে যা দরকার। কিন্তু বড় ইনিংসে রূপান্তরের হার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পারভেজ হোসেন ইমন জায়গার লড়াইয়ে আছেন। ওডিআইয়ে ছবিটা বেশি স্থির — লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ উভয়েই ইনিংস দীর্ঘ করতে পারেন। মুশফিকুর রহিমের মিরপুরের পিচ পড়ার ক্ষমতা দুই দশকের অভিজ্ঞতার ফল। বাংলাদেশ ব্যাটিং লাইনআপে প্রতিভার অভাব নেই কখনও। প্রশ্নটা সবসময় ছিল — চাপের মুহূর্তে সেই প্রতিভা একসাথে কাজ করতে পারে কিনা।

বাংলাদেশ T20 বিশ্বকাপ ২০২৬ থেকে বাদ: ভারত বয়কটের পর স্কটল্যান্ড টাইগারদের জায়গা নিয়েছে

যেখানে বাংলাদেশের সুবিধা সত্যিকারের

স্পিন বোলিং। এটা জটিল কথা নয়, গোপন তথ্যও নয়। মিরপুরের পিচ ঐতিহাসিকভাবে স্পিনারদের সাহায্য করে, বিশেষত ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে। চট্টগ্রামেও একই রকম। মেহেদী হাসান মিরাজ ওডিআই অধিনায়ক ও মূল অফস্পিনার হিসেবে এমন এক পরিপক্কতায় পৌঁছেছেন যে ঘরের মাঠে তাঁকে খেলা সত্যিই কঠিন। তাঁর সাথে আছেন নাসুম আহমেদ ও রিশাদ হোসেন। তিনজন মানসম্পন্ন স্পিনার, তিন ধরনের দক্ষতা। এশিয়ান কন্ডিশনে উচ্চমানের স্পিনের বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের রেকর্ড — বলতে গেলে তারা এই সমস্যার সমাধান কখনও পুরোপুরি করতে পারেনি।

পেসে তাসকিন আহমেদ সিনিয়র মুখ। শরিফুল ইসলাম বাঁহাতি বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছেন। মুস্তাফিজুর রহমানের এই বছরটা সহজ ছিল না — আইপিএল চুক্তি নিয়ে জটিলতা বিশ্বকাপ প্রত্যাহারের আগের উত্তেজনায় যোগ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি দলে ফিরেছেন এবং নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ আছে। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মুস্তাফিজের কাটার ও স্লোয়ার বল সবচেয়ে কার্যকর হয়। এই পিচগুলো তিনি চেনেন — দীর্ঘদিন ধরেই।

নিউজিল্যান্ড যেভাবে আসছে

মিচেল স্যান্টনারের দল আগের সেই নিউজিল্যান্ড নয় যারা বাংলাদেশে আসত এবং উপমহাদেশের পিচকে ততটা গুরুত্ব দিত না। বর্তমান দলটা নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। এবং তারা র‍্যাচিন রবীন্দ্রের মতো ক্রিকেটার তৈরি করেছে যিনি স্পিন শুধু সামলান না, বুঝেও খেলেন।

রবীন্দ্র এই সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল। বাঁহাতি ব্যাটার, স্পিনের বিরুদ্ধে পরিষ্কার কৌশল, বিভিন্ন পরিবেশে খেলার অভিজ্ঞতা। মিরপুরে তিনি লম্বা ইনিংস খেললে নিউজিল্যান্ডের ওডিআই স্কোর প্রতিযোগিতামূলক হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্পিনাররা তাঁকে আটকাতে পারলে বাকি ইনিংস প্রায়ই তাসের ঘরের মতো ভাঙে।

টি-টোয়েন্টিতে ফিন অ্যালেন ওপেনিংয়ে ঝড় তোলার ক্ষমতা রাখেন — ছয় ওভারে যেকোনো লক্ষ্য অর্থহীন করে দিতে পারেন, আবার সস্তায় আউট হলে কিছুই হয় না। লকি ফার্গুসনের গতি যেকোনো মাঠে বিপজ্জনক। ডেভন কনওয়ে, ড্যারিল মিচেল, গ্লেন ফিলিপস মিডল অর্ডারে গভীরতা দেন। জেমস নিশাম শেষ ওভারে রান করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে কম মূল্যায়িত নামগুলোর একটি।

নিউজিল্যান্ড সর্বশেষ বাংলাদেশে ওডিআই সিরিজ জিতেছিল ২০১৩ সালে। তেরো বছর। তিনটি সফর। দুটো সিরিজ হার। পিচ, দর্শক, পরিবেশ — সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সফরকারী দলের জন্য যা দরকার তার বেশিরভাগই অনুকূলে থাকে না। ব্ল্যাক ক্যাপসও এর ব্যতিক্রম নয়।

ইতিহাস বলছে কী

২০২১ সালের হোম ওডিআই সিরিজ জয়, ২০২৩ সালেও একই ফলাফল — এটা কাকতালীয় নয়। এটা একটা ধারা, যা তৈরি হয়েছে ঘরের পিচ, স্পিন-বান্ধব উইকেট এবং শেরে বাংলার দর্শকদের চাপ দিয়ে। সফরকারী দলগুলো এই চাপকে প্রায়ই ছোট করে দেখে — যতক্ষণ না চাপের মধ্যে ব্যাট করতে হচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিউজিল্যান্ড এর কোনো উত্তর পায়নি।

টি-টোয়েন্টিতে দ্বিপক্ষীয় রেকর্ড পাতলা — আগের একমাত্র সিরিজটা নিউজিল্যান্ড জিতেছিল। এই ফরম্যাটে ব্ল্যাক ক্যাপসের ব্যাটিং গভীরতা ও আক্রমণাত্মক টপ অর্ডার স্পিন-সহায়ক পিচেও জয়ের সুযোগ রাখে। ওডিআই সিরিজে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে বলেই মনে হয়। টি-টোয়েন্টি সিরিজ হবে সত্যিকারের লড়াই।

স্কোরবোর্ডের বাইরে যা আছে

বিশ্বকাপ থেকে সরে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট ও তার দর্শকদের সম্পর্কে একটা টান তৈরি হয়েছে। সিদ্ধান্তটা ভারতের সাথে ভূরাজনৈতিক জটিলতার ফল ছিল — এটা অনেকে বোঝেন। কিন্তু অনেকে মেনে নিতে পারেননি যে একটি পূর্ণ সদস্য দেশ বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পরেও খেলতে যায়নি। স্কটল্যান্ড বাংলাদেশের জায়গায় খেলেছে। টাইগাররা ঘরে বসেছিল। এটা যেকোনো ক্রিকেটপ্রেমীর জন্য কষ্টের।

নিউজিল্যান্ড সিরিজ সেই স্মৃতি মুছবে না। কিন্তু ছয়টা ম্যাচ, সত্যিকারের উদ্যম ও মানের সাথে খেলা হলে, কথোপকথনের গতি বদলে দিতে পারে। পরপর তৃতীয়বার নিউজিল্যান্ডকে ওডিআই সিরিজে হারানো হবে একটা বার্তা। জানুয়ারির ঘটনা মুছবে না। কিন্তু মানুষকে — এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, দলের খেলোয়াড়দের — মনে করিয়ে দেবে যে এই দল কী করতে পারে যখন রাজনৈতিক শোরগোল থামে এবং মিরপুরের মাঠে এগারোজন মানুষ সত্যিকারের কিছু প্রমাণ করতে নামে।

এপ্রিল আসছে। ব্ল্যাক ক্যাপস পথে আছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই সিরিজের দরকার নিউজিল্যান্ডের চেয়ে অনেক বেশি — আর সেটাই হয়তো টাইগারদের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

win-tk.org একটি WInTk প্রকাশনা।