সাত ম্যাচ, সাত জয় — টাইগ্রেসরা যাচ্ছেন ইংল্যান্ডে
পুরুষ দলকে নিয়ে যখন কূটনৈতিক ঝড় বইছিল, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল নেপালে গিয়ে চুপচাপ অসাধারণ কিছু একটা করে ফেলল। আইসিসি মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ গ্লোবাল কোয়ালিফায়ার ২০২৬-এ তারা সাতটি ম্যাচ খেলল — এবং সাতটিতেই জিতল। একটি হার নেই। একটি সংশয়ের মুহূর্ত নেই। নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্বে বাংলাদেশ মহিলা দল টুর্নামেন্টটি শেষ করল নিখুঁত রেকর্ড নিয়ে।
বাংলাদেশ এখন ইংল্যান্ড যাচ্ছে। আইসিসি মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ১০ম আসর বসবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে, ১২ জুন থেকে ৫ জুলাই ২০২৬। এই বিশাল মঞ্চে বাংলাদেশ থাকবে — যোগ্যতা অর্জন করে, কর্তৃত্বের সাথে, এবং এমন একটি অর্জন নিয়ে যা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। 2 পুরো কোয়ালিফায়ার ক্যাম্পেইন কভার করেছে এবং এখানে সম্পূর্ণ গল্পটি তুলে ধরা হচ্ছে।
আইপিএল ২০২৬ সূচি, দল ও ম্যাচ তালিকা: বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমীদের সম্পূর্ণ গাইড
কোয়ালিফায়ারের পটভূমি: নেপাল, জানুয়ারি ২০২৬
নেপালের মুলপানি এবং কীর্তিপুরের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মাঠে আয়োজিত হয়েছিল এই কোয়ালিফায়ার। ছয়টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল চারটি স্থানের জন্য — বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র এবং থাইল্যান্ড।
বাংলাদেশ দলকে গ্রুপ এ-তে রাখা হয়েছিল পাপুয়া নিউ গিনি, নামিবিয়া, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে। দলের অধিনায়কত্বে নিগার সুলতানা জ্যোতি, ভাইস-ক্যাপ্টেন নাহিদা আক্তার। স্কোয়াডে ছিলেন সোবহানা মোস্তারি, শারমিন আক্তার, দিলারা আক্তার, জুয়েরিয়া ফেরদাউস, রিতু মনি, ফাহিমা খাতুন, শর্না আক্তার, রাবেয়া খান, মারুফা আক্তার সহ আরও অনেকে। নেপাল যাওয়ার আগেই বাংলাদেশ দল ২০২৫ সালের মহিলা বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল।
মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিল কেকেআর: বিসিসিআই কেন বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের আইপিএল ২০২৬ থেকে বাদ দিল
সাতটি জয়ের গল্প
ম্যাচ ১ — যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে: প্রথম ম্যাচে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ পোস্ট করল ১৫৮/৫। শারমিন আক্তার ৩৯ বলে ৬৩ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেললেন — ৮টি চার, ১টি ছক্কা। বোলিংয়ে নাহিদা আক্তার ৪ উইকেট, রিতু মনি ৩ উইকেট, রাবেয়া খান ২ উইকেট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ১৩৭/৯-এ আটকে দেন। ২১ রানের জয়, শারমিন ম্যান অব দ্য ম্যাচ।
ম্যাচ ২ — পাপুয়া নিউ গিনির বিরুদ্ধে: আবারও ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ করল ১৬৮/৫। পিএনজি অলআউট হলো ১৩৮/৯-এ। ৩০ রানের জয়।
ম্যাচ ৩ — নামিবিয়ার বিরুদ্ধে: নামিবিয়া বাংলাদেশকে ব্যাট করতে পাঠাল, ১৪৪/৭ হলো। জবাবে নামিবিয়া মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে গেল। সঞ্জিদা আক্তার মেঘলা ৪ উইকেট, রাবেয়া খান ৩ উইকেট, ফাহিমা খাতুন ৩ উইকেট নিলেন। ৮০ রানের বিশাল জয়।
ম্যাচ ৪ — আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে: শারমিন আক্তারের ৫২ এবং দিলারা আক্তারের ৩৫ রানের সুবাদে বাংলাদেশ ১৫৩/৭ তুলল। আয়ারল্যান্ডের গ্যাবি লুইস ৭৩ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলে দলকে কাছাকাছি নিয়ে গেলেন — শেষ ওভারের আগে পড়ে গেলেন রাবেয়া খানের বলে। বাংলাদেশ জিতল ৯ রানে। শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ, কিন্তু জয় বাংলাদেশেরই।
ম্যাচ ৫ — থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে (সুপার সিক্সেস): মুলপানিতে থাইল্যান্ড বাংলাদেশকে ব্যাট করতে পাঠাল। প্রথম বলেই দিলারা আক্তার আউট, দ্বিতীয় ওভারে শারমিনও। সংকটে পড়ল দল। কিন্তু এরপর উইকেটকিপার জুয়েরিয়া ফেরদাউস (৪৫ বলে ৫৬) ও সোবহানা মোস্তারি (৪২ বলে ৫৯) তৃতীয় উইকেটে ১১০ রানের অবিশ্বাস্য জুটি গড়লেন। বাংলাদেশ পৌঁছাল ১৬৫/৮-এ। মারুফা আক্তার ৩ উইকেট নিয়ে থাইল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে দিলেন। ৩৯ রানের জয়, সোবহানা ম্যান অব দ্য ম্যাচ।
ম্যাচ ৬ — স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে: কোয়ালিফিকেশন নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ জয়ের ধারা অব্যাহত রাখল। স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে আনবিটেন রেকর্ড ধরে রাখল।
ম্যাচ ৭ — নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে: ফাইনাল ম্যাচে নাহিদা আক্তার প্রথমে বোলিংয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করলেন — ৪ ওভারে মাত্র ১০ রানে ৩ উইকেট নিয়ে নেদারল্যান্ডসকে ২৩/৫-এ ফেলে দিলেন। শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস ১০২/৬ করল। ১০৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে শুরুতে ২ উইকেট হারাল বাংলাদেশ। কিন্তু নিগার সুলতানা ৪৪ বলে অপরাজিত ৫০ রান এবং সোবহানা মোস্তারি ২৩ বলে ৩৩ রানে অপরাজিত থেকে দলকে ১০৫/৩-এ পৌঁছে দিলেন — ২০ বল বাকি। সাত থেকে সাত।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বাংলাদেশ কেন ছিল না: ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট সংকটের পূর্ণ বিবরণ
যাঁরা মিলে তৈরি করলেন এই ইতিহাস
শারমিন আক্তার ছিলেন গ্রুপ পর্বের সেরা ব্যাটার। দুটি হাফ-সেঞ্চুরি এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা রান-স্কোরার বানিয়ে দিল। নাহিদা আক্তারের বাঁহাতি স্পিন সারা টুর্নামেন্ট জুড়েই অপ্রতিরোধ্য ছিল — সর্বমোট ৮ উইকেট নিয়ে কোয়ালিফায়ারের শেষে টি-টোয়েন্টি বোলার র্যাংকিংয়ে ৮ ধাপ এগিয়ে ২৮ নম্বরে উঠে এলেন।
নিগার সুলতানা জ্যোতির অধিনায়কত্ব এই টুর্নামেন্টে অনুকরণীয় ছিল। ব্যাটার হিসেবে ১৫৪ রান, কোয়ালিফায়ারের পর টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং র্যাংকিংয়ে ১৯ নম্বরে — এশিয়ার সেরা মহিলা ক্রিকেটারদের একজন। 2 নিগার সুলতানাকে এই কোয়ালিফায়ারের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সোবহানা মোস্তারি র্যাংকিংয়ে ১৬ ধাপ এগিয়ে গেলেন। রাবেয়া খান, মারুফা আক্তার, ফাহিমা খাতুন — বোলিং বিভাগের প্রতিটি সদস্য নিজের ভূমিকা পালন করলেন নিখুঁতভাবে। এটি কোনো একক তারার টুর্নামেন্ট ছিল না — এটি ছিল একটি পুরো দলের অর্জন। 2-তে পুরো টুর্নামেন্টের খেলোয়াড়-ভিত্তিক বিশ্লেষণ পড়া যাচ্ছে।
ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের ম্যাচসূচি
বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে গ্রুপ ১-এ, যেখানে আছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান এবং নেদারল্যান্ডস। গ্রুপটি কঠিন — কিন্তু এটাই বাংলাদেশের সুযোগ।
১৪ জুন রোববার: বাংলাদেশ বনাম নেদারল্যান্ডস — এজবাস্টন, সকাল ১০:৩০ বিএসটি (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩:৩০)। ১৭ জুন বুধবার: বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া — হেডিংলি, সকাল ১০:৩০ বিএসটি। ২০ জুন শনিবার: বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান — হ্যাম্পশায়ার বোল, বিকাল ২:৩০ বিএসটি। ২৫ জুন বৃহস্পতিবার: বাংলাদেশ বনাম ভারত — ওল্ড ট্রাফোর্ড, ম্যানচেস্টার। ২৮ জুন রোববার: বাংলাদেশ বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা — লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড, সকাল ১০:৩০ বিএসটি।
লর্ডসে খেলা — ক্রিকেটের পবিত্রতম মাঠে — বাংলাদেশ মহিলা দলের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হবে। আর ওল্ড ট্রাফোর্ডে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটি পুরো বাংলাদেশ অনুসরণ করবে।
বাংলাদেশ কি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২৭-এ সরাসরি যোগ্যতা পাবে?
একটি দল যারা যতটুকু পায় তার চেয়ে বেশি দেয়
বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল সবসময় প্রাপ্য সম্মানের চেয়ে কম পেয়েছে। সম্পদ কম, মিডিয়া কভারেজ কম, দর্শকদের মনোযোগ কম। কিন্তু মাঠের ভেতরে এই দলটি বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে।
নাহিদ রানা: বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুত বোলার পাকিস্তানকে ৫/২৪-এ ধ্বংস করলেন
নেপালে সাতটি জয়ের এই রেকর্ড সেই ঐতিহ্যেরই সর্বশেষ প্রকাশ। পুরুষ দল বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েছে রাজনীতির কারণে। কিন্তু মহিলা দল কোনো বিবৃতি ছাড়াই, কোনো নাটক ছাড়াই — শুধু ক্রিকেট খেলে — ইতিহাস তৈরি করে এলেন নেপালের মাটি থেকে।
ইংল্যান্ডে জুন-জুলাইতে তাঁদের অপেক্ষা করছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান। কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু টাইগ্রেসরা যাচ্ছেন আত্মবিশ্বাস নিয়ে, নিখুঁত রেকর্ড নিয়ে, এবং পুরো বাংলাদেশের সমর্থন নিয়ে। বিশ্বকাপ জুড়ে বাংলাদেশের প্রতিটি ম্যাচের বিশ্লেষণ, প্রিভিউ এবং লাইভ কভারেজের জন্য 2 ও WinTK পড়তে থাকুন।