নাহিদ রানা: আমের দেশ থেকে উঠে আসা বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুত বোলার
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম-এর জন্য বিখ্যাত, ক্রিকেটের জন্য নয়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম কোণে ভারত সীমান্তে এই জেলা। এখানে কখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের পাইপলাইন ছিল না। কিন্তু ছিল একটা লম্বা, অস্থির কিশোর — নাহিদ রানা — যে গলির টেপ-টেনিস বলে সবার চেয়ে দ্রুত বোলিং করত, তখনও জানত না এই গতি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।
১১ মার্চ ২০২৬, মিরপুরের শের-ই-বাংলায় বিশ্ব আবার জানল এই গতি কী করতে পারে। পাঁচ উইকেট মাত্র ২৪ রানে। পাকিস্তান গুটিয়ে ১১৪-এ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ওডিআই জয় পাকিস্তানের বিপক্ষে — ৮ উইকেটে, ২০৯ বল বাকি থাকতে। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ নাহিদ রানা। বয়স মাত্র ২৩। এটি একটি WinTK Official প্রকাশনা।
শুরুর গল্প: চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী একাডেমি
নাহিদ রানার জন্ম ২ অক্টোবর ২০০২, চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ক্রিকেটকে গুরুত্বের সাথে শুরু করেছেন ১৮ বছর বয়সে — ২০২০ সালে এইচএসসি পাসের পর। বাংলাদেশি ক্রিকেটের মানদণ্ডে এটা অত্যন্ত দেরি। আন্ডার-১৯ বিশ্বকাপ খেলেননি। বয়সভিত্তিক দলের পথ মাড়াননি। সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এসেছেন।
রাজশাহীর একটি একাডেমিতে কোচ আলমগীর কবির তাঁকে দেখে তাৎক্ষণিক বুঝলেন — এই ছেলে আলাদা। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতা। হাই-আর্ম একশন থেকে এমন বাউন্স উঠত যা মিডিয়াম পেসে সম্ভব নয়। কবির রান-আপ ঠিক করলেন। সাঁতার কাটা ও আম গাছে ওঠার মতো কাজ পেশিতে শক্তি যোগ করল।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর রাজশাহী বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। ২০২২-২৩ জাতীয় ক্রিকেট লিগে ৪১ উইকেট নিলেন মাত্র ১৮.২৬ গড়ে। তাঁর চেয়ে বেশি উইকেট নিলেন শুধু দু'জন মিডিয়াম পেসার। একজন সত্যিকারের দ্রুত বোলারের জন্য এই সংখ্যা ছিল অভূতপূর্ব।
রেকর্ড যা তাঁকে সংজ্ঞায়িত করে: ১৫২ কিমি/ঘণ্টা
বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে দ্রুত বলের রেকর্ড নাহিদ রানার: ১৫২.০ কিমি/ঘণ্টা। ২০২৪ সালের আগস্টে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে এই বল ছোড়েন। সেই টেস্টেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের মাটিতে প্রথমবার টেস্ট সিরিজ জিতেছিল — ২-০। রানার দ্বিতীয় ইনিংসে চার উইকেট সেই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই ম্যাচে তাঁর ৭৩ শতাংশ বল ছিল ১৪০ কিমি/ঘণ্টার বেশি।
২০২৪ সালের টেস্ট ক্রিকেটে গড় গতিতে শুধু ইংল্যান্ডের মার্ক উড (১৪৫.৩১) রানার (১৪০.৯৩) চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। মিচেল স্টার্ক ছিলেন ১৪০.১৪ কিমি/ঘণ্টায় — রানার পেছনে। ১৮ বছর বয়সে ক্রিকেট শুরু করা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছেলে টেস্টে স্টার্কের চেয়ে দ্রুত বোলিং করছেন — এই সংখ্যা বলে দেয় নাহিদ রানা কতটা অসাধারণ।
বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ২-১-এ হারিয়ে ওডিআই সিরিজ জিতল ২০২৬
৫/২৪: যে স্পেল পাকিস্তানকে মিলিয়ে দিল
১১ মার্চ ২০২৬, মিরপুর। প্রথম ওভারে ফারহান এজ দিলেন। দ্বিতীয়তে শামিল হুসেন টপ-এজ। তৃতীয়তে মাজ সাদাকত। চতুর্থতে মোহাম্মদ রিজওয়ান ৪ রানে আউট। পঞ্চমতে সালমান আঘা। পাঁচ ওভার, পাঁচ উইকেট।
সাত ওভার শেষে রানার ফিগার ৫/২৪। ওডিআইতে তাঁর প্রথম পাঁচ উইকেট। পাকিস্তান ১১৪ অল আউট — বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের সর্বনিম্ন ওডিআই স্কোর। ম্যাচ শেষে রানা বললেন: "পরিকল্পনা ছিল সহজ — বোলিংয়ে এসে উইকেট নিতে হবে।" এই স্পেল নিয়ে আলোচনায় যোগ দিন WinTK Community-তে।
পাকিস্তান: রানার বিশেষ শিকার
রানার পাকিস্তান-বিরোধী রেকর্ড সব ফরম্যাটে চোখে পড়ার মতো। ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছিলেন ফ্ল্যাট পিচেও। এখন ২০২৬ সালে ওডিআইতেও একই ছবি। তিন ম্যাচের সিরিজে ৮ উইকেট গড় ১৮.১২-এ। তানজিদ হাসানের সাথে যৌথ সিরিজসেরার পুরস্কার। পাকিস্তানের ব্যাটাররা এখনো তাঁর বিপক্ষে কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে পাচ্ছে না।
বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর ২০২৬: টেস্ট ও ওডিআই সিরিজ প্রিভিউ
বাংলাদেশের পেস বিপ্লবের প্রতীক
রানা শূন্য থেকে আসেননি। তাসকিন আহমেদের দৃঢ়তা, মুস্তাফিজুর রহমানের সিম দক্ষতা এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডিউকস বল ব্যবহারের নীতি — এই বিবর্তনের ধারায় রানার আগমন। কিন্তু তিনি আগেরটা থেকে আলাদা। মাশরাফে মর্তুজা, তাসকিন, মুস্তাফিজুর — কেউ ১৫২ কিমি/ঘণ্টায় বল করেননি। কেউ টেস্টে ধারাবাহিকভাবে ১৪০-এর উপরে ছিলেন না।
ESPNcricinfo লিখেছিল: "বাংলাদেশ থেকে এর আগে এত দ্রুত বোলার হয়তো আসেনি।" ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতায় হাই-আর্ম একশনে ১৪০-১৫০ কিমি/ঘণ্টায় বোলিং, ওডিআইতে পাঁচ উইকেট — এই বয়সে এই অর্জন নিয়ে তাঁর সিলিং হিসেব করা কঠিন।
গতির আড়ালের মানুষ
রানা শুধু কাঁচা পেস নন। আইসিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন: "আমি বরং ছন্দ ও রিলিজে মনোযোগ দিতে চাই। শিখেছি যে শরীরের যত্ন নিলে গতি এমনিই আসে। যদি শরীর ভালো থাকে, গতিও ঠিক থাকবে।" বোলিং কোচ শন টেইটের তত্ত্বাবধানে কাজ করছেন — যিনি নিজে ওডিআই ইতিহাসের দ্রুততম বল করেছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গলির টেপ-টেনিস বল থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুত বোলারের শিরোনামে — নাহিদ রানার গল্প এখনো লেখা হচ্ছে। সেরা অধ্যায়গুলো প্রায় নিশ্চিতভাবে এখনো সামনে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সর্বশেষ আপডেটের জন্য WinTK Official ফলো করুন এবং আলোচনায় যোগ দিন WinTK Community-তে। এটি একটি WinTK Official প্রকাশনা।