যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই

২০২৬ সালের আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এখন শেষ পর্যায়ে। ফেব্রুয়ারি ৭ তারিখে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে ২০টি দল অংশ নিয়েছিল। এখন চারটি দল বাকি — সেমিফাইনালে ভারত, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড। বাংলাদেশ এই চারটির মধ্যে নেই। যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে নয় — জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিজেই সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভারতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ — মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের আইপিএল চুক্তি থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল — সেটাই ছিল মূল কারণ। আইসিসি নিরপেক্ষ ভেন্যুর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। বাংলাদেশ ঘরে রইল। স্কটল্যান্ড তাদের জায়গায় গ্রুপ সিতে খেলল।

এই পরিপ্রেক্ষিতটা ভুলে গেলে চলবে না — কিন্তু টুর্নামেন্টটাও ভুলে গেলে চলবে না। দক্ষিণ আফ্রিকা আটটি ম্যাচে একবারও হারেনি। ইংল্যান্ড পঞ্চম বারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছে — একটানা পাঁচবার, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ড। অস্ট্রেলিয়া গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়েছে। ভারত সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৭৬ রানে হেরে তারপর কোনোরকমে সেমিফাইনালে উঠেছে। ঢাকা থেকে টি স্পোর্টস ও নাগরিক টিভিতে দেখছেন বাংলাদেশের দর্শকরা — এডেন গার্ডেনস বা ওয়াংখেড়ে থেকে নয়। কিন্তু দেখছেন, এবং টুর্নামেন্টটা দেখার যোগ্য হয়েছে।

বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া ২০২৬: পনেরো বছর পর ঘরের মাঠে হিসাব মেটানোর সুযোগ

টুর্নামেন্টের কাঠামো কীভাবে কাজ করে

২০২৬ সালের সংস্করণ দশম পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, এবং ২০২৪ সালের সম্প্রসারণের পর দ্বিতীয়বারের মতো ২০ দল নিয়ে আয়োজিত। চারটি পর্যায়ে টুর্নামেন্ট সাজানো হয়েছে। গ্রুপ পর্বে ২০ দলকে চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল, প্রতি গ্রুপে পাঁচটি করে দল। প্রতি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুটি দল সুপার এইটে উঠেছে। সুপার এইটে আটটি দলকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়, প্রতি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুটি সেমিফাইনালে যায়। সেমিফাইনাল ৪ ও ৫ মার্চ, ফাইনাল ৮ মার্চ আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে।

ভেন্যু ছড়িয়ে আছে দুই দেশের আটটি মাঠে। ভারতে — আহমেদাবাদে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম, চেন্নাইয়ে এমএ চিদম্বরম স্টেডিয়াম, দিল্লিতে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম, কলকাতায় ইডেন গার্ডেনস, মুম্বাইয়ে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম। শ্রীলঙ্কায় — কলম্বোতে আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, কলম্বোতেই সিনহালিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠ, এবং কান্দিতে পাল্লেকেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। পাকিস্তান তাদের সব গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় খেলেছে — ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী যেকোনো আইসিসি টুর্নামেন্টে যদি এক দেশ আয়োজক হয়, তাহলে অন্য দেশ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলে।

গ্রুপগুলো যেভাবে সাজানো হয়েছিল

গ্রুপ এ-তে ছিল ভারত, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস, নামিবিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোর আর প্রেমাদাসায় খেলা হয়েছিল — গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে দেখা ম্যাচ। গ্রুপ থেকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উঠেছে, পাকিস্তানকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান গ্রুপ পর্বের বড় চমক।

গ্রুপ বি-তে ছিল অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড ও ওমান। ২০২১ সালের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া এখান থেকে পার পাবে বলে ধরা হয়েছিল। পারেনি। শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে সুপার এইটে উঠেছে, অস্ট্রেলিয়া গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকেছে। ২০ দলের বিশ্বকাপে এটা প্রথমবার। এই ফলাফল পুরো টুর্নামেন্টের ছবি বদলে দিয়েছিল।

গ্রুপ সি-তে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ড। ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, স্কটল্যান্ড, নেপাল ও ইতালি এই গ্রুপে ছিল। ইংল্যান্ড গ্রুপ জিতেছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় হয়েছে। স্কটল্যান্ড প্রথম দুটি ম্যাচ জিতে তারপর শেষ দুটিতে হেরে তৃতীয় হয়েছে — বাদ পড়েছে, কিন্তু সম্মানজনকভাবে খেলেছে। ইতালি প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে চারটি ম্যাচে হেরেছে, কিন্তু ইংল্যান্ডকে শেষ ওভার পর্যন্ত লড়াই করতে বাধ্য করেছে।

গ্রুপ ডি-তে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, আরব আমিরাত ও কানাডা। দক্ষিণ আফ্রিকা চারটি ম্যাচের চারটিই জিতেছে। নিউজিল্যান্ড তাদের সাথে সুপার এইটে গেছে। আফগানিস্তান, যাদের কাছ থেকে অনেকে সুপার এইট প্রত্যাশা করেছিল, তৃতীয় হয়ে বাদ পড়েছে।

সুপার এইটে কী হলো

সুপার এইটে গ্রুপ ১-এ ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গ্রুপ ২-এ ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। গ্রুপ ১-এর গল্পটা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার একক আধিপত্যের। তারা ভারতকে ৭৬ রানে হারিয়েছে — সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের পরাজয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নয় উইকেটে উড়িয়ে দিয়েছে। গ্রুপ ১ থেকে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় আসন নির্ধারিত হয়েছে ১ মার্চ ইডেন গার্ডেনসে ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ ম্যাচে। ভারত পাঁচ উইকেটে জিতেছে।

গ্রুপ ২-এ ইংল্যান্ড সেরা দল ছিল। শ্রীলঙ্কাকে ৫১ রানে হারিয়ে শুরু, তারপর পাকিস্তানকে দুই উইকেটে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে। নিউজিল্যান্ড সুপার এইটে উঠেছে নেট রান রেটের সুবাদে — পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের প্রথম ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসেছিল, পরে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে পাকিস্তানের আগে থেকেছে। পাকিস্তান টানা দ্বিতীয়বার সুপার এইটে বাদ পড়েছে।

বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ড ২০২৬: টাইগারদের হিসাব মেটানোর সিরিজ

সেমিফাইনাল ও ফাইনাল

সেমিফাইনাল দুটি: ৪ মার্চ কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম নিউজিল্যান্ড, ৫ মার্চ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে ভারত বনাম ইংল্যান্ড। ৮ মার্চ ফাইনাল আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে — বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট মাঠ, ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৩২ হাজার।

দক্ষিণ আফ্রিকা আট ম্যাচে অপরাজিত — এই টুর্নামেন্টের প্রধান দাবিদার। ইংল্যান্ড টানা পঞ্চম সেমিফাইনালে — জফ্রা আর্চারের বোলিং ও হ্যারি ব্রুকের অধিনায়কত্ব মিলিয়ে দলটা ভালো ছন্দে আছে। ভারত ঘরের মাঠে সবসময়ই চাপের সাথে খেলে, এবার সেই চাপ এমন এক সেমিফাইনালে যেখানে তারা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি। নিউজিল্যান্ড নেট রান রেটে টিকে আছে — তারা এই টুর্নামেন্টের সম্ভাব্য আন্ডারডগ গল্প।

বাংলাদেশে কীভাবে দেখবেন

বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো দেখা যাচ্ছে টি স্পোর্টস ও নাগরিক টিভিতে — দুটোই সরাসরি সম্প্রচার করছে। অনলাইনে দেখার জন্য র‍্যাবিটহোল অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে সরাসরি স্ট্রিমিং পাওয়া যাচ্ছে। সেমিফাইনাল ও ফাইনাল তিনটি প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশের বাইরে থাকলে — ভারতে স্টার স্পোর্টস ও জিওহটস্টার, ইংল্যান্ডে স্কাই স্পোর্টস, অস্ট্রেলিয়ায় প্রাইম ভিডিও, নিউজিল্যান্ডে স্কাই স্পোর্ট, পাকিস্তানে পিটিভি ও মাইকো এবং ডিজিটালে তামাশা, এআরওয়াই জ্যাপ ও ট্যাপমড, যুক্তরাষ্ট্রে উইলো টিভি। আইসিসি-র নিজস্ব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ICC.tv অনেক দেশে বিনামূল্যে সব ম্যাচ দেখাচ্ছে — সম্পূর্ণ তালিকা আইসিসির ওয়েবসাইটে আছে।

স্কটল্যান্ড এবং যে প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে

গ্রুপ সি-তে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ড যেভাবে খেলেছে, সেটা নিয়ে বাংলাদেশি দর্শকদের মধ্যে একটা জটিল অনুভূতি তৈরি হয়েছে। স্কটল্যান্ড প্রথম দুটি ম্যাচ জিতেছে — তারা সুযোগটা ভালোভাবেই নিয়েছে। তৃতীয় হয়ে বাদ পড়েছে, কিন্তু মাথা উঁচু করেই। তাদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই — তারা এই সুযোগের যোগ্য ছিল না, পেয়েছে কারণ বাংলাদেশ চলে গেছে।

এই টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য একটা রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে থাকবে। অস্ট্রেলিয়া গ্রুপ থেকে বাদ পড়েছে। পাকিস্তান সুপার এইটে। ভারত সেমিফাইনালে টিকতে একটি ম্যাচ-উইনার দরকার হয়েছে। ক্রিকেটের শীর্ষ দলগুলোর এই দুর্বলতাগুলো বাংলাদেশ যদি মাঠে থাকত, হয়তো কাজে লাগানো যেত। জুনে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে আসছে — গ্রুপ পর্বে বিদায় নেওয়া অস্ট্রেলিয়া। সেই ম্যাচের আগে এই প্রশ্নটা মনে রাখা দরকার।

win-tk.org একটি WinTK প্রকাশনা।