ফ্রান্সেস হগেন যা প্রকাশ করেছিলেন — এবং কেন এটি শুধু আমেরিকার বিষয় নয়
২০২১ সালের অক্টোবরে ফ্রান্সেস হগেন মার্কিন সিনেটের একটি শুনানিতে উপস্থিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে বৈশ্বিক আলোচনা চিরতরে বদলে দেন। ফেসবুকের সাবেক ডেটা বিজ্ঞানী হগেন পদত্যাগের আগে কয়েক মাস ধরে গোপনে কোম্পানির হাজার হাজার পৃষ্ঠার অভ্যন্তরীণ নথি সংগ্রহ করেছিলেন। সেসব নথি যা প্রকাশ করেছিল তা ছিল স্পষ্ট: ফেসবুকের নিজস্ব গবেষণাই নিশ্চিত করেছিল যে এই প্ল্যাটফর্ম ভুল তথ্য প্রসার ঘটায়, কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, সামাজিক বিভেদ তৈরি করে এবং কোনো কোনো অঞ্চলে সরাসরি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ভূমিকা রাখে — এবং কোম্পানির নেতৃত্ব বারবার এই ক্ষতি মোকাবেলার চেয়ে মুনাফা ও এনগেজমেন্ট সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
হগেন সিনেটরদের বলেছিলেন, ফেসবুক "শিশুদের ক্ষতি করে, বিভেদ বাড়ায় এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।" তাঁর প্রকাশ করা ইনস্টাগ্রামের অভ্যন্তরীণ গবেষণা দেখিয়েছিল, ৩২ শতাংশ কিশোরী বলেছে নিজেদের শরীর নিয়ে খারাপ লাগলে ইনস্টাগ্রাম তাদের আরও খারাপ অনুভব করায়। ১৩.৫ শতাংশ জানিয়েছে ইনস্টাগ্রাম আত্মহত্যার চিন্তা আরও বাড়িয়ে দেয়। ফেসবুকের নিজস্ব গবেষকরাই লিখেছিলেন যে তারা প্রতি তিনজন কিশোরীর একজনের শরীরের ইমেজ সমস্যা আরও গভীর করছে — এই তথ্য কোম্পানি কখনো প্রকাশ করেনি। হগেনের মূল যুক্তি ছিল কাঠামোগত: ফেসবুকের এনগেজমেন্টভিত্তিক অ্যালগরিদম ডিজাইন করা হয়েছে তীব্র আবেগ সৃষ্টিকারী কনটেন্ট সামনে আনতে, কারণ সেটি প্ল্যাটফর্মে থাকার সময় বাড়ায়। ক্রোধ, ভয়, বিভেদমূলক কনটেন্ট — এগুলো সিস্টেমের মেট্রিক্সে সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করে।
হগেন ২০২৩ সালে একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন এবং প্ল্যাটফর্ম স্বচ্ছতা ও অ্যালগরিদমিক জবাবদিহির জন্য Beyond the Screen নামে একটি অলাভজনক সংস্থা গড়েন। তাঁর প্রকাশিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে অ্যারন সোরকিনের লেখা একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণাধীন। চার বছর পরেও তাঁর সমালোচনা কমেনি — বরং আরও জরুরি হয়েছে, কারণ এই প্ল্যাটফর্মগুলো দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দেশগুলোতে আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ ঠিক সেই তালিকায় আছে।
বাংলাদেশে ফেসবুকের বিস্তার কতটা গভীর
ব্যবহারকারী সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ফেসবুক বাজার। DataReportal-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহারকারী প্রায় ৬ কোটি — মোট জনসংখ্যার ৩৪.৩ শতাংশ এবং দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৭৭ শতাংশ। NapoleonCat-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই সংখ্যা ৭ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী গোষ্ঠী — ৩ কোটিরও বেশি। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাত্র এক বছরে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার ২২.৩ শতাংশ বেড়েছে।
এই সংখ্যাগুলোর একটি কাঠামোগত গুরুত্ব আছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য — বিশেষত শহরের বাইরে — ফেসবুক শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি সংবাদ, স্বাস্থ্য তথ্য, রাজনৈতিক আলোচনা এবং সামাজিক জীবনের প্রধান দরজা। হগেন এই কনফিগারেশনকে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছিলেন: যখন একটি প্ল্যাটফর্ম একটি জনগোষ্ঠীর জন্য ইন্টারনেটে পরিণত হয়, তখন তার ডিজাইনের ত্রুটি ও কনটেন্ট মডারেশনের ব্যর্থতা একক ব্যবহারকারীর সমস্যা থাকে না। সেটি পুরো সমাজের তথ্য পরিবেশের কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়।
এক দশকের নথিভুক্ত ক্ষতি
বাংলাদেশে ফেসবুকের কনটেন্ট মডারেশন ব্যর্থতার প্রমাণ হগেনের ফাঁস করা নথির অপেক্ষা রাখে না — দেশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রেকর্ড করা ঘটনাগুলো নিজেই সাক্ষী। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বাংলাদেশের প্রথম বড় ফেসবুক-প্ররোচিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ বৌদ্ধ পল্লী আক্রমণ করে — একটি বিকৃত ছবি প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার পর। পরবর্তী বছরগুলোতে বারবার একই ধরন পুনরাবৃত্তি হয়েছে: ইসলাম অবমাননার অভিযোগ — প্রায়ই মিথ্যা বা প্রসঙ্গহীন — দ্রুত ছড়িয়ে অ্যালগরিদমিক বিস্তার পেয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতায় পরিণত হয়েছে।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা এই অঞ্চলে ফেসবুক অ্যালগরিদমিক ক্ষতির সবচেয়ে চরম প্রমাণিত ঘটনা — এবং এর পরিণতি সরাসরি বাংলাদেশে এসে পড়েছে, যেখানে এখন কক্সবাজার ও আশপাশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। হগেনের নথির উপর আংশিকভাবে নির্মিত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২২ সালের প্রতিবেদন জানায়, মেটার অ্যালগরিদম ২০১২ সাল থেকেই রোহিঙ্গাবিরোধী কনটেন্ট সক্রিয়ভাবে প্রচার করেছে — ২০১৭ সালের গণহত্যার বহু আগে থেকে। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দল ২০১৮ সালেই নিশ্চিত করেছিল যে ফেসবুক রোহিঙ্গাদের নিন্দা প্রচারে "কার্যকর হাতিয়ার" হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নথি দেখায়, ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে মিয়ানমারের ১২ লাখ সক্রিয় ব্যবহারকারীর বিপরীতে ডাবলিনে বসে মাত্র একজন বার্মিজ-ভাষী কনটেন্ট মডারেটর কাজ করতেন। ২০১৯ সালের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে লেখা ছিল, প্ল্যাটফর্মে ঘৃণামূলক বক্তব্যের মাত্র প্রায় দুই শতাংশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক উত্তাল সময় — কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী গণঅভ্যুত্থান — নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম একত্রে মেরুকৃত আখ্যান প্রসারিত করেছে, ভুল তথ্য ছড়িয়েছে এবং বাস্তবে সহিংসতায় অবদান রেখেছে। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলা ভাষায় ফেসবুকের কনটেন্ট মডারেশন দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতুল থেকেছে, ফলে ক্ষতিকর বাংলা কনটেন্ট পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ছাড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।
নিয়ন্ত্রণ যখন প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে নয়, নাগরিকের বিরুদ্ধে
সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশের আইনগত প্রতিক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণভাবে নাগরিকদের মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের দিকে পরিচালিত হয়েছে — প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের কার্যক্রমের জন্য জবাবদিহি করানোর দিকে নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ (ডিএসএ) — যাকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল "স্বৈরতান্ত্রিক" বলেছিল — সরকারের সমালোচনামূলক বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতজনক অনলাইন বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডিএসএ-তে ৭ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে — তার ৬০ শতাংশ ফেসবুক কার্যক্রমের জন্য। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মামলা করেছে। অভিযুক্তদের মাত্র দুই শতাংশের মামলা আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ডিএসএ বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) পাস হয়। অ্যামনেস্টি এটিকে পূর্ববর্তী "স্বৈরতান্ত্রিক" আইনের প্রতিলিপি বলে বর্ণনা করেছে। আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ (সিএসও) গ্রহণ করেছে। এটি কিছু বহুল-বিচারিত ধারা সরিয়েছে, তবে Article 19 জানিয়েছে এতে এখনো অস্পষ্ট ধারা আছে যা বক্তৃতা দমনে ব্যবহৃত হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই অধ্যাদেশ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের উপর বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে — কিন্তু প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে কাজ করে তার জন্য কোনো স্বচ্ছতা, মানবাধিকার মূল্যায়ন বা জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা রাখেনি।
তরুণ প্রজন্মের উপর প্রভাব
ফেসবুকের অ্যালগরিদমিক ডিজাইনের প্রভাব বাংলাদেশের তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা বাংলাদেশে ফেসবুকের সবচেয়ে বড় ডেমোগ্রাফিক গোষ্ঠী — ৩ কোটিরও বেশি — এবং বয়স গোপন করে অ্যাকাউন্ট তৈরির কারণে বাস্তবে অ্যাক্সেস করা জনগোষ্ঠী আরও কম বয়সী। হগেনের সাক্ষ্যে যে ফিডব্যাক লুপের কথা বলা হয়েছিল — কিশোরীরা শরীর নিয়ে হীনমন্যতার কনটেন্ট দেখলে অ্যালগরিদম আরও বেশি সেই ধরনের কনটেন্ট দেয়, যা তাদের আরও বেশি প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখে — এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশেও একইভাবে কাজ করছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের সূচক বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীরা চেহারাভিত্তিক সামাজিক তুলনার কনটেন্টে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ডিজিটাল সাক্ষরতার পদ্ধতিগত শিক্ষার অভাব, অভিভাবকদের প্ল্যাটফর্ম-জ্ঞানের ঘাটতি এবং বিদ্যমান লিঙ্গ বৈষম্য — এসব মিলিয়ে বাংলাদেশে এই ক্ষতির প্রভাব আরও গভীর হচ্ছে।
জবাবদিহি বলতে আসলে কী বোঝায়
হগেন ২০২১ সাল থেকে বারবার বলেছেন, কনটেন্ট মডারেশন একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না — কারণ সমস্যাটি কনটেন্টের নয়, স্থাপত্যের। যতদিন ফেসবুকের সিস্টেম ক্রোধ, ভয় ও বিভেদকে পুরস্কৃত করবে বৃহত্তর বিস্তারের মাধ্যমে, ততদিন প্রতিক্রিয়াশীল কনটেন্ট অপসারণ যথেষ্ট হবে না। পরিবর্তন আনতে হলে হয় স্বেচ্ছামূলক প্ল্যাটফর্ম পুনর্নকশা প্রয়োজন — যার কোনো আগ্রহ মেটার মধ্যে দেখা যায়নি — অথবা নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা দরকার।
বাংলাদেশের জন্য অর্থবহ জবাবদিহির শুরু হওয়া উচিত অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা দিয়ে: মেটাকে প্রকাশ করতে বাধ্য করা যে বাংলাদেশে তাদের রিকমেন্ডেশন সিস্টেম কীভাবে কাজ করে, কোন ধরনের কনটেন্ট বেশি বিস্তার পায় এবং বাংলা ভাষার কনটেন্ট মডারেশন পাইপলাইনে কীভাবে পরিচালিত হয়। ৭ কোটির বেশি ব্যবহারকারীর অনুপাতে বাংলা ভাষায় যথেষ্ট মডারেশন সক্ষমতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের একটি মার্কিন আপিল আদালতের রায় — যেখানে বলা হয়েছে Section 230 সুরক্ষা টিকটকের রিকমেন্ডেশন অ্যালগরিদমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় — এই বৈশ্বিক নজির বাংলাদেশের নীতি আলোচনায় আসতে পারে।
হগেন ২০২১ সালে কর্পোরেট নথির মাধ্যমে যা অনস্বীকার্য করেছিলেন — যে ফেসবুক জেনেশুনে এমন একটি অ্যালগরিদম পরিচালনা করে যা ক্ষতি করে, এবং মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে বেছে নিয়েছে — সেটি আজও বাংলাদেশের ৭ কোটি ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন বাস্তবতা। এই প্রকাশনা বৈশ্বিক আলোচনা পরিবর্তন করেছিল। বাংলাদেশে নীতিগত সাড়া এখনো সেই পরিবর্তনের পথে হাঁটেনি।
win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা, যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সংবাদ পরিবেশন করে।