যে আইন বাংলাদেশকে চুপ করিয়ে রেখেছিল — এবং তার জায়গায় কী এলো

সাত হাজার মামলা। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এতজন বাংলাদেশিকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট, বিরোধী রাজনীতিবিদ, ফেসবুকে ভুল কথা লেখা সাধারণ মানুষ। এই আইনকে সবাই বলত "কালো আইন।"

তারপর এলো প্রতিশ্রুতির চক্র। ২০২৩ সালে ডিএসএ-র জায়গায় আনা হলো সাইবার নিরাপত্তা আইন। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলল — নতুন বোতলে পুরনো বিষ। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন হলো। এরপর ২০২৫ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আনল সাইবার সেফটি অর্ডিন্যান্স — পুরনো আইনের নয়টি ধারা বাতিল, সব ডিএসএ মামলা খারিজ, এবং প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি।

বাংলাদেশের ৮ কোটি ২০ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য এটি কি সত্যিকারের পরিবর্তন — নাকি আরও একটি দীর্ঘ গল্পের নতুন অধ্যায়?

তারেক রহমানের প্রথম ১০০ দিন: বিএনপির নীতি ও দিকনির্দেশনা

ডিএসএ থেকে সিএসএ, তারপর সাইবার সেফটি অর্ডিন্যান্স

২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হয়েছিল সাইবারক্রাইম মোকাবেলার কথা বলে। বাস্তবে হয়ে উঠল রাজনৈতিক নিপীড়নের অস্ত্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলেছিল এটি "সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে নিষ্ঠুর আইনগুলোর একটি।" অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নথি করেছিল কীভাবে এটি মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে।

২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে হাসিনা সরকার ডিএসএ-র জায়গায় আনল সাইবার নিরাপত্তা আইন। কিন্তু অ্যামনেস্টির বিশ্লেষণে উঠে এলো — নতুন আইনে ডিএসএ-র ৬২টি ধারার মধ্যে ৫৮টি রয়ে গেছে। ২৮টি হুবহু একই, ২৫টিতে সামান্য পরিবর্তন। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বিবৃতি দিয়ে জানাল — নতুন আইনও "মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে অপরাধ মনে করে।"

তারপর এলো জুলাই ২০২৪। ছাত্র-জনতা একটি সরকার ফেলে দিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলো। এবং ২০২৫ সালের মে মাসে এলো সাইবার সেফটি অর্ডিন্যান্স — হাসিনা সরকার যতটুকু করতে রাজি ছিল না, তার চেয়ে অনেক বেশি।

নয়টি ধারা বাতিল: আসলে কী বদলাল

বাতিল হওয়া নয়টি ধারা ছোটখাট প্রযুক্তিগত বিষয় ছিল না। এগুলোই ছিল আইনের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র।

ধারা ২৫ — "আপত্তিকর, মিথ্যা বা ভীতিকর তথ্য" পাঠানো বা প্রকাশ করার শাস্তি। এই সংজ্ঞা এত অস্পষ্ট ছিল যে প্রায় যেকোনো সমালোচনামূলক পোস্টকে অপরাধ হিসেবে দেখানো যেত। ধারা ২৮ — "ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত" করা কন্টেন্টের শাস্তি, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে বারবার ব্যবহার হয়েছে।

বাতিল হওয়া ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারা ২৯ — মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা জাতীয় প্রতীক সম্পর্কে সমালোচনামূলক কন্টেন্টের শাস্তি। এই ধারাটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি বাতিল হওয়া মানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বক্তব্যের আইনি ভূচিত্র সত্যিকার অর্থেই বদলে গেছে।

সব মামলা খারিজ: অ্যামনেস্টি যা চেয়েছিল

নতুন অর্ডিন্যান্সের ধারা ৫০ বলছে — বাতিল হওয়া ধারাগুলোর অধীনে চলমান সব তদন্ত, বিচার ও কার্যক্রম খারিজ। আগে দেওয়া সব রায় ও জরিমানাও বাতিল।

২০২৫ সালের অক্টোবরে অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল — ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর অধীনে দায়ের সব মামলাও খারিজ করা হলো। যে হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ে আটকে ছিলেন — সাংবাদিক, ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট, সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী — তাদের জন্য কার্যত সাধারণ ক্ষমা।

আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল নিশ্চিত করেছেন, "আইনের অধীনে দায়ের হওয়া বেশিরভাগ মামলাই ওই ধারাগুলোর ভিত্তিতে ছিল।"

নতুন অর্ডিন্যান্সে আসলে কী আছে

সাইবার সেফটি অর্ডিন্যান্স ২০২৫ শুধু পুরনো আইন থেকে নয়টি ধারা বাদ দেওয়া নয়। এতে সত্যিকারের নতুন কাঠামোও আছে।

ধারা ২(লা) ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এই অ্যাক্সেস অননুমোদিতভাবে বিঘ্নিত করা — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে হলেও — অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় বাংলাদেশে ইন্টারনেট শাটডাউন হয়েছিল। এই ধারাটি সেই অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া।

ধারা ১৭ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরঞ্জামের অপব্যবহার করে হ্যাকিং বা সাইবার অপরাধের বিষয়টি আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ ও ন্যাশনাল ডেটা প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ অনুমোদন করেছে — বাংলাদেশিদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় এটি প্রথম আইনি কাঠামো।

যে উদ্বেগ এখনও আছে

মানবাধিকার সংগঠনগুলো পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু বিজয় ঘোষণা করেনি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ: নতুন অর্ডিন্যান্সেও ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতারের ক্ষমতা পুলিশের হাতে রয়ে গেছে।

২০০৬ সালের আইসিটি অ্যাক্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি ডিজিটাল আইনে এই ক্ষমতা ছিল এবং প্রতিটিতেই এর অপব্যবহার হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ক্ষমতা সরিয়ে নেওয়াকে তার মূল দাবিগুলোর একটি করেছিল। ইউনূস সরকার সেটি করেনি।

তারেক রহমানের বিএনপি সরকার এই সংস্কারগুলো আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে কিনা — সেটি এখনও অজানা। বিএনপি নিজেই হাসিনা আমলে ডিএসএ-র শিকার হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা সংস্কার টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক প্রণোদনা দেয়। কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালীন একই সরঞ্জাম হাতে পেলে সেই প্রণোদনা কতটা টেকে — এটাই প্রশ্ন।

তারেক রহমানের প্রথম ১০০ দিন: নতুন বিএনপি সরকারের নীতি ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা

বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য এর মানে কী

ডিএসএ থেকে সাইবার সেফটি অর্ডিন্যান্স — এটি ২০০৬ সালের পর বাংলাদেশের ডিজিটাল বাকস্বাধীনতা আইনের সবচেয়ে বড় সংস্কার। সাংবাদিকদের জন্য মানে — মানহানির মামলায় আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারের ঝুঁকি নেই। অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য মানে — অস্পষ্ট "আপত্তিকর কন্টেন্ট" ধারার ফাঁদ আর নেই।

সিলেটের ছাত্র, চট্টগ্রামের গার্মেন্টকর্মী, রাজশাহীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী — যারা প্রতিদিন অনলাইনে মত প্রকাশ করেন — তাদের জন্য এটি বারো মাস আগের চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ।

এটি বাস্তব। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশ পুরোপুরি মুক্ত ডিজিটাল পরিবেশে পৌঁছে গেছে — এমন বলার সময় এখনও আসেনি। একটি অধ্যায় শেষ হয়েছে। গল্পটি চলছে।

win-tk.org একটি wintk প্রকাশনা। বাংলাদেশের প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়ে স্বাধীন সংবাদের জন্য ভিজিট করুন win-tk.org। যোগাযোগ: editor@win-tk.org