মাত্র আঠারো থেকে আটষট্টি: জামায়াতের উত্থানের পেছনে কী আছে?
আঠারো। এটাই ছিল জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ — ১৯৯১ সালে। এরপর আর কখনো কাছেও আসেনি। তারপর এলো ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফলে দেখা গেল জামায়াত একাই পেয়েছে ৬৮ আসন। মিত্রদের নিয়ে মোট ৭৭। বাংলাদেশ পেল নতুন প্রধান বিরোধী দল — যে দল ১৯৭১ সালে এই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।
চমকটা তাৎক্ষণিক ছিল। প্রশ্নগুলো আরও বড়।
যে দলটি একসময় নিষিদ্ধ হয়েছিল, যার নেতারা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ড পেয়েছিলেন, যে দলটি বিএনপির জুনিয়র অংশীদার হয়ে দুটো মন্ত্রিত্বে সন্তুষ্ট ছিল — সে দলটি হঠাৎ সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন নিয়ে কীভাবে বসল?
তিন থেকে আটষট্টি: সংখ্যার পেছনের গল্প
১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্রভাবে লড়ে জামায়াত পেয়েছিল মাত্র তিনটি আসন। ১৯৯১ সালের ১৮ আসন ছিল তাদের ইতিহাসের সেরা। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে দুটো মন্ত্রণালয় পেয়েছিল।
তারপর শেখ হাসিনার সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করে। নিবন্ধন বাতিল হয়। নেতারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হন। অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরপরই মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ২০২৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নিবন্ধন ফিরিয়ে দেয়। আর মাত্র আট মাসের মধ্যে জামায়াত বাংলাদেশের সংসদে প্রধান বিরোধী দল।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক একেএম ওয়ারেসুল করিম প্রথম আলোকে বলেছেন, জামায়াত নিজেদের রক্ষণশীল ডানপন্থী পরিচয় থেকে মধ্য-ডানপন্থী অবস্থানে সরিয়ে আনতে সফল হয়েছে। "দলটি নিজেদের ক্ষমতালোভী নয়, পরিবর্তনপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছে — এটি তরুণ ভোটারদের কাছে সাড়া ফেলেছে।"
কারা ভোট দিল — এবং কেন
শুধু ইসলাম দিয়ে ৬৮ আসন ব্যাখ্যা করা যাবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহু বছর ধরে সুফি ঐতিহ্য, মাজার সংস্কৃতি এবং মধ্যপন্থী ধর্মীয় পরিচয় দ্বারা গঠিত — যা জামায়াতের কট্টর অবস্থানের সঙ্গে বরাবরই সংঘর্ষে এসেছে।
২০২৬ সালে যা বদলেছে তা হলো রাজনৈতিক মানচিত্র। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। ভোটারদের কাছে দুটো বাস্তব বিকল্প: বিএনপি অথবা জামায়াত। যারা আগে জামায়াতকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাদের এবার বিএনপিতে যেতে হয়েছে — অথবা জামায়াতে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের জুন ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে ২২.২১ শতাংশ তরুণ পুরুষ এবং ২০.৫৭ শতাংশ তরুণ নারী জামায়াতকে ভোট দিতে চান। ইসলামী ছাত্রশিবির বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জিতেছে। জামায়াতের তৃণমূল দাতব্য নেটওয়ার্ক — খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা উপকরণ — রাষ্ট্র যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে সত্যিকারের বিশ্বাস অর্জন করেছে।
ভৌগোলিকভাবেও একটা গল্প আছে। জামায়াত মূলত পশ্চিম ভারতীয় সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে জিতেছে — যা বিশ্লেষকরা ২০২৪ উত্থানের পর তীব্র হওয়া ভারত-বিরোধী মনোভাবের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। হাসিনা সরকারে ভারতের কথিত সমর্থন এবং পরাজিত প্রধানমন্ত্রীকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি জনমনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছিল। জামায়াত সেই ক্ষোভের সুবিধা পেয়েছে।
১৯৭১-এর প্রশ্ন যা মিলিয়ে যায় না
জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তার পূর্বসূরি সংগঠন মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল। নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অত্যাচার — ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যার অভিযোগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অনেক নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
দলটি এই অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা প্রতিটি আলোচনার কেন্দ্রে থাকে।
যে প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে নিয়ে বড় হয়েছে, তাদের কাছে এই দলটির প্রধান বিরোধী দল হওয়া গভীরভাবে উদ্বেগজনক। আর যে প্রজন্ম ১৯৭১-এর দশকের পর জন্মেছে, তাদের হিসাব আলাদা। তারা দেখেছে এমন একটি দল যে আওয়ামী লীগ যখন নজরদারি চালিয়েছে তখন কল্যাণমূলক কাজ করেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে, ভিন্ন হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শফিকুর রহমানের প্রতিশ্রুতি — এবং তার মানে
জামায়াত আমির শফিকুর রহমান প্রথমে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিলেন। তারপর ফলাফল মেনে নেন। তাঁর বিবৃতি ছিল সুচিন্তিত: "আমরা সামগ্রিক ফলাফল স্বীকার করি এবং আইনের শাসনকে সম্মান করি। আমরা সতর্ক, নীতিনিষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ বিরোধী দল হিসেবে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখব।"
মগবাজারের দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিনি আরও বললেন: "৭৭ আসন নিয়ে আমরা সংসদীয় উপস্থিতি প্রায় চারগুণ করেছি। এটি ব্যর্থতা নয়। এটি ভিত্তি।"
কিসের ভিত্তি? জামায়াতের "পলিসি সামিট ২০২৬"-এ ছিল ভ্যাট কমানো, সুদমুক্ত ঋণ, দুর্নীতি দমন। দলটি এখন নিজেদের কল্যাণমুখী অর্থনীতির সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু সংসদীয় বিরোধিতার চাপে এই অবস্থান কতটা ধরে রাখা যাবে, সেটাই মূল পরীক্ষা।
জুলাই জাতীয় সনদ: প্রথম বাস্তব পরীক্ষা
সংসদ অধিবেশন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই প্রথম ফাটল দেখা গেল। বিএনপি সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে অস্বীকার করলেন। জামায়াত, যে দলটি সনদ ও সংস্কারকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিল, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। মিত্র এনসিপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাল।
নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬০.২৬ শতাংশ ভোটার সনদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। দ্বিকক্ষীয় সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা — এই দাবিগুলো বাস্তবায়নে জামায়াত বিএনপিকে জবাবদিহি করাতে পারবে কিনা, সেটাই তাদের "নীতিনিষ্ঠ বিরোধিতার" প্রথম পরীক্ষা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল আল জাজিরাকে বলেছেন: "বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পরবর্তী নির্বাচনে জেতার লক্ষ্য নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে বলে আশা করা যায়। সংসদীয় রাজনীতিতে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা যুক্তিসঙ্গত।"
৮ কোটি ২০ লাখ মানুষের জন্য এর মানে কী
ফোনের স্ক্রিনে এই সব দেখছেন যে কোটি কোটি বাংলাদেশি, তাদের প্রশ্ন বিশ্লেষণের বাইরে।
জামায়াত কি বিএনপি সরকারের ওপর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে, আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে, সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নে সত্যিকারের চাপ দিতে পারবে? নাকি পরিশেষে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শাসক দলকে নীরবে মেনে নেওয়া বিরোধী দলেই পরিণত হবে?
দলটির তৃণমূল দাতব্য নেটওয়ার্ক — খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসা, শিক্ষা — তাকে রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি কিছু করে তুলেছে। যদি জামায়াত সেই বিশ্বাসযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে সরকারকে কল্যাণ সেবা দিতে বাধ্য করে, তাহলে তার ৬৮ আসন সত্যিকার অর্থেই কার্যকর হবে।
না হলে, শফিকুর রহমান যে ভিত্তির কথা বলেছেন — তা বালির উপর গড়া।